১. অর্জুনবিষাদযোগ
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শুরু কোনো শান্ত আশ্রমে নয়, শুরু একটা যুদ্ধক্ষেত্রে। মহাভারতের ভীষ্মপর্বের ভেতরে এই গ্রন্থটি রাখা আছে। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে দুই পক্ষের বিশাল সেনা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে — একদিকে কৌরব, অন্যদিকে পাণ্ডব। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র প্রাসাদে বসে আছেন, আর তাঁর সারথি সঞ্জয় দিব্যদৃষ্টিতে যুদ্ধক্ষেত্রের সব কিছু দেখে তাঁকে বর্ণনা করছেন। গীতার প্রায় সব কথাই তাই আসলে সঞ্জয়ের মুখে শোনা একটা কথোপকথন — শ্রীকৃষ্ণ আর অর্জুনের মধ্যে।

প্রথম প্রশ্ন: কী করল ওরা?
গীতার প্রথম শ্লোকটিই একটা প্রশ্ন। ধৃতরাষ্ট্র জানতে চান, ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের ইচ্ছা নিয়ে জড়ো হওয়া তাঁর ছেলেরা আর পাণ্ডুর ছেলেরা কী করল। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, তিনি বলছেন ‘আমার ছেলেরা’ আর ‘পাণ্ডুর ছেলেরা’ — যেন দুটো আলাদা পরিবার। এই ছোট্ট ভাগাভাগির মধ্যেই লুকিয়ে আছে গোটা যুদ্ধের বীজ: ‘আমার’ আর ‘ওদের’।
धर्मक्षेत्रे कुरुक्षेत्रे समवेता युयुत्सवः।
मामकाः पाण्डवाश्चैव किमकुर्वत सञ्जय॥— গীতা ১.১
সহজ অর্থ: হে সঞ্জয়, পুণ্যভূমি কুরুক্ষেত্রে লড়াইয়ের জন্য একত্র হয়ে আমার পক্ষের লোকেরা আর পাণ্ডবেরা তারপর কী করল, আমাকে বলো।
অর্জুনের মন ভেঙে পড়ল
অর্জুন ছিলেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, রথটা দুই সেনার মাঝখানে নিয়ে চলো, দেখি কাদের সঙ্গে আমাকে লড়তে হবে। রথ এগিয়ে গেল। আর তখনই অর্জুন দেখলেন — উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছেন পিতামহ ভীষ্ম, অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য, কাকা, মামা, ভাই, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন। এক মুহূর্তে বীর যোদ্ধার হাত কাঁপতে শুরু করল, গলা শুকিয়ে গেল, হাত থেকে গাণ্ডীব ধনু খসে পড়ার উপক্রম হলো।
অর্জুন অনেক যুক্তি দিলেন। আপনজনকে মেরে রাজ্য পেয়ে কী লাভ? এমন জয়ে সুখ কোথায়? যুদ্ধে পরিবার ভাঙবে, সমাজের নিয়ম নষ্ট হবে। শেষে তিনি ধনুক নামিয়ে রথের পেছনে বসে পড়লেন, চোখ জলে ভরা। এই হতাশা আর দোটানাকেই বলা হয় ‘বিষাদ’ — তাই অধ্যায়ের নাম অর্জুনবিষাদযোগ।
বিষাদ কেন ‘যোগ’?
মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, দুঃখ আর হতাশা আবার যোগ হয় কী করে? এর সুন্দর একটা ব্যাখ্যা আছে। অর্জুন যদি ভেঙে না পড়তেন, তিনি কখনো প্রশ্ন করতেন না; আর প্রশ্ন না করলে গীতার শিক্ষাও আসত না। অর্থাৎ সৎ মনে স্বীকার করা যে ‘আমি বুঝতে পারছি না, আমি আটকে গেছি’ — এটাই শেখার প্রথম দরজা। বিষাদ এখানে শেষ নয়, শুরু।
আজকের জীবনেও আমরা বারবার এমন মোড়ে দাঁড়াই। বোর্ড পরীক্ষার আগের রাতে মনে হয় কিছুই পড়া হয়নি। নতুন চাকরির প্রথম দিনে মনে হয়, আমি পারব না। পরিবারের কারও সঙ্গে কঠিন সত্যি কথা বলতে হবে, অথচ সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে মুখ খুলতে পারছি না। এসব মুহূর্তে আমরা প্রত্যেকেই একটু একটু অর্জুন। প্রথম অধ্যায় আমাদের বলে — এমন ভয় পাওয়া লজ্জার নয়, স্বাভাবিক। লজ্জার হলো সেই ভয়কে আড়াল করে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া, অথবা কারও পরামর্শ না নিয়ে একা একা ভেঙে পড়ে থাকা।
আরেকটা জিনিস চোখে পড়ে। অর্জুনের যুক্তিগুলো শুনতে খুব ভালো, দয়ায় ভরা। কিন্তু গভীরে আছে মোহ — প্রিয়জনের প্রতি টান আর কর্তব্য থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা। অনেক সময় আমরাও আসল ভয়টাকে সুন্দর যুক্তির পোশাক পরিয়ে রাখি। ‘এখন সময় নেই’, ‘পরে দেখা যাবে’ — এর আড়ালে থাকে কাজটার মুখোমুখি হওয়ার ভয়। নিজের মনকে সৎভাবে দেখতে শেখাটাও এই অধ্যায়ের একটা নীরব শিক্ষা।
এই অধ্যায় থেকে শিক্ষা
- ভয়, দ্বিধা বা হতাশা আসা স্বাভাবিক; সবচেয়ে বড় বীরেরও আসে।
- ‘আমার’ আর ‘ওদের’ — এই ভাগাভাগি অনেক বিরোধের মূলে থাকে।
- নিজের দুর্বলতা সৎভাবে স্বীকার করাই শেখার প্রথম ধাপ।
- সুন্দর যুক্তির আড়ালে আসল ভয়টা লুকিয়ে আছে কি না, যাচাই করে দেখো।
- আটকে গেলে একজন বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শকের কাছে মন খুলে বলো — যেমন অর্জুন বলেছিলেন শ্রীকৃষ্ণকে।