২. সাংখ্যযোগ
অর্জুন যখন বললেন, ‘আমি যুদ্ধ করব না, আমার কী করা উচিত বুঝতে পারছি না, তুমি আমাকে শেখাও’ — তখন থেকেই শুরু হয় শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ। দ্বিতীয় অধ্যায়কে অনেকে গোটা গীতার সারসংক্ষেপ বলেন, কারণ পরের অধ্যায়গুলোতে যত বড় বড় ভাবনা এসেছে, তার প্রায় সবকটির বীজ এখানেই রোপণ করা আছে।

শরীর বদলায়, আত্মা থাকে
শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে অর্জুনের শোকের গোড়ায় হাত দেন। তিনি বলেন, যাঁদের জন্য তুমি শোক করছ, তাঁদের আসল সত্তা — আত্মা — কখনো জন্মায় না, কখনো মরে না। শরীর জন্মায়, বড় হয়, বুড়ো হয়, একদিন চলে যায়; কিন্তু শরীরের ভেতরে যে চেতনা, সে চিরকালের। এর একটা সুন্দর উপমা দিয়েছেন তিনি: মানুষ যেমন পুরোনো জামা ফেলে নতুন জামা পরে, তেমনি আত্মা পুরোনো শরীর ছেড়ে নতুন শরীর নেয়।
এই ভাবনাটা আজকের মানুষের কাছে কী কাজে লাগে? প্রিয়জনকে হারানোর কষ্ট কেউ মুছে দিতে পারে না। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি মনকে একটু শক্ত করে — যা বাইরে থেকে দেখা যায়, সেটাই সব নয়। একইভাবে, আমাদের চেহারা, বয়স, পদ, টাকাপয়সা বদলাবেই; এগুলোকে নিজের পরিচয়ের পুরোটা ভেবে বসলে প্রতিটা বদলেই আমরা ভেঙে পড়ব।
কাজ করো, ফলের দাস হয়ো না
দ্বিতীয় অধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত কথাটি সম্ভবত গোটা গীতারই সবচেয়ে পরিচিত শ্লোক।
कर्मण्येवाधिकारस्ते मा फलेषु कदाचन।
मा कर्मफलहेतुर्भूर्मा ते सङ्गोऽस्त्वकर्मणि॥— গীতা ২.৪৭
সহজ অর্থ: তোমার হাতে আছে শুধু কাজটা করা; তার ফল কী হবে, সেটা তোমার নিয়ন্ত্রণে নয়। ফল পাওয়াকেই কাজের একমাত্র কারণ বানিয়ো না, আবার তাই বলে কাজ না করার দিকেও ঝুঁকে পোড়ো না।
এর মানে এই নয় যে লক্ষ্য রাখা যাবে না। একজন ছাত্রী ভালো ফলের আশা করতেই পারে। কিন্তু তার হাতে আছে রোজ মন দিয়ে পড়া, প্রশ্নের অনুশীলন করা, ঠিক সময়ে ঘুমানো। পরীক্ষার প্রশ্ন কেমন আসবে, পরীক্ষক কেমন নম্বর দেবেন — এসব তার হাতে নেই। যে শুধু ফলের চিন্তায় ডুবে থাকে, সে দুশ্চিন্তায় পড়াটাই ঠিকমতো করতে পারে না। যে কাজে মন দেয়, তার মন হালকা থাকে, আর কাজও ভালো হয়।
योगस्थः कुरु कर्माणि सङ्गं त्यक्त्वा धनञ्जय।
सिद्ध्यसिद्ध्योः समो भूत्वा समत्वं योग उच्यते॥— গীতা ২.৪৮
সহজ অর্থ: হে অর্জুন, মনকে স্থির রেখে, আসক্তি ছেড়ে কাজ করো। সফল হলে বা না হলে — দুই অবস্থাতেই মনকে সমান রাখো। মনের এই সমতাকেই যোগ বলে।
স্থিতপ্রজ্ঞ: শান্ত মনের মানুষ
অধ্যায়ের শেষে অর্জুন জানতে চান, যার বুদ্ধি স্থির, সেই মানুষটা কেমন — কীভাবে কথা বলে, কীভাবে চলে? শ্রীকৃষ্ণ বর্ণনা দেন: সুখে সে উচ্ছ্বাসে ভেসে যায় না, দুঃখে ভেঙে পড়ে না; রাগ, ভয় আর লোভ তাকে চালায় না। কচ্ছপ যেমন দরকার হলে হাত-পা গুটিয়ে নেয়, তেমনি সে প্রয়োজনে ইন্দ্রিয়কে বিষয় থেকে গুটিয়ে আনতে পারে। আজকের ভাষায় বললে — ফোনের প্রতিটা নোটিফিকেশনে যার মন লাফিয়ে ওঠে না, সমালোচনায় যে আগুন হয়ে যায় না, প্রশংসায় যে আকাশে ওড়ে না।
এই অধ্যায় থেকে শিক্ষা
- শরীর, বয়স, পদ বদলায়; ভেতরের চেতনা স্থির থাকে।
- নিজের দায়িত্ব মন দিয়ে পালন করো, ফলের দুশ্চিন্তায় কাজ নষ্ট কোরো না।
- সাফল্য আর ব্যর্থতায় মনের সমতা রাখাই যোগ।
- ইন্দ্রিয় আর মনের লাগাম নিজের হাতে রাখতে শেখো।