←
কাব্যকথাCh 1/10 · 5 min
Theme
Text size
Reading mode
কাব্যকথা1. অধ্যায় ১ — মহাকাব্য কাকে বলে2. অধ্যায় ২ — কালিদাসের মেঘদূত🔒 অধ্যায় ৩ — অভিজ্ঞানশকুন্তলম্🔒 অধ্যায় ৪ — কুমারসম্ভব🔒 অধ্যায় ৫ — রঘুবংশ🔒 অধ্যায় ৬ — মেঘনাদবধ কাব্য: মাইকেল মধুসূদন দত্ত🔒 অধ্যায় ৭ — কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীরাম দাসের মহাভারত🔒 অধ্যায় ৮ — গীতগোবিন্দ: জয়দেব🔒 অধ্যায় ৯ — চর্যাপদ ও মঙ্গলকাব্য🔒 অধ্যায় ১০ — তামিল ও অন্যান্য ভাষার মহাকাব্য

Log in to save highlights and notes.

Chapter 1

অধ্যায় ১ — মহাকাব্য কাকে বলে

ছোটবেলায় ঠাকুমা-দিদিমার মুখে আমরা যে গল্পগুলো শুনি, তার অনেকগুলোরই শিকড় খুব গভীরে — হাজার দেড়-হাজার, কখনও তারও বেশি বছর আগে লেখা কোনো কাব্যে। রামের বনবাস, শকুন্তলার আংটি, বেহুলার ভেলা, রাধাকৃষ্ণের মান-অভিমান — এসব কাহিনি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ভেসে এসেছে কবিদের হাত ধরে। এই বইয়ে আমরা সেই কবি আর তাঁদের কাব্যের কাছে একটু একটু করে পৌঁছব। কিন্তু তার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর জেনে নেওয়া দরকার — মহাকাব্য আসলে কী? যে-কোনো লম্বা কবিতাকেই কি মহাকাব্য বলা যায়?

কলম আর পুঁথি — হাজার বছরের কাব্যধারার প্রতীক
কলম আর পুঁথি — হাজার বছরের কাব্যধারার প্রতীক

কাব্য, ইতিহাস আর মহাকাব্য

প্রাচীন ভারতে সাহিত্যের নানা ভাগ ছিল। বাল্মীকির রামায়ণ আর ব্যাসদেবের মহাভারতকে সাধারণত ইতিহাস বলা হয় — অর্থাৎ 'এমনটাই ঘটেছিল' এই বিশ্বাসে বলা প্রাচীন কাহিনি। তবে রামায়ণের আরেকটি সম্মানের নাম আছে: আদিকাব্য, আর বাল্মীকি আদিকবি। প্রচলিত কাহিনি বলে, এক ব্যাধ মিলনরত ক্রৌঞ্চ-দম্পতির একটিকে তির মেরে মেরে ফেলায় বাল্মীকির মনে যে গভীর শোক জেগেছিল, তা-ই আপনা থেকে ছন্দোবদ্ধ শ্লোক হয়ে বেরিয়ে আসে। শোক থেকে শ্লোক — এভাবেই নাকি কাব্যের জন্ম।

পরের শতাব্দীগুলোয় সংস্কৃতে এক নতুন ধরনের রচনা গড়ে ওঠে, যাকে বলা হল মহাকাব্য বা সর্গবন্ধ কাব্য। এগুলো ইতিহাসের মতো বিশাল নয়, কিন্তু সুপরিকল্পিত, অলংকারে সাজানো, সচেতনভাবে শিল্পিত। রামায়ণ-মহাভারত যেন বিশাল নদী — কত শাখা, কত উপকাহিনি; আর পরবর্তী মহাকাব্যগুলো যেন যত্নে বাঁধানো সরোবর — আকারে ছোট, কিন্তু প্রতিটি ঘাট পাথরে খোদাই করা।

আলংকারিকদের চোখে মহাকাব্যের লক্ষণ

সংস্কৃত সাহিত্যতত্ত্বের পণ্ডিতদের বলা হয় আলংকারিক। এঁদের মধ্যে আনুমানিক সপ্তম শতাব্দীর আচার্য দণ্ডী তাঁর 'কাব্যাদর্শ' গ্রন্থে মহাকাব্যের চেহারা বেশ বিস্তারিতভাবে বুঝিয়েছেন। অনেক পরে, আনুমানিক চতুর্দশ শতকে, বিশ্বনাথ কবিরাজ তাঁর 'সাহিত্যদর্পণ'-এ এই লক্ষণগুলো আরও গুছিয়ে লেখেন। সব মিলিয়ে একটি আদর্শ মহাকাব্যের যে ছবি পাওয়া যায়, তা মোটামুটি এরকম:

এই তালিকা দেখে মনে হতে পারে, মহাকাব্য লেখা বুঝি একটা নিয়মের খাতা মিলিয়ে কাজ করা। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। নিয়মগুলো এসেছে বড় কবিদের কাজ দেখেই; পরে অন্য কবিরা সেই কাঠামোর মধ্যে নিজেদের প্রতিভা দেখিয়েছেন। ঠিক যেমন রাগসংগীতে রাগের নিয়ম থাকে, কিন্তু প্রত্যেক ওস্তাদ সেই নিয়মের মধ্যেই নিজের রং ফোটান।

পঞ্চ মহাকাব্য — সংস্কৃতের পাঁচ রত্ন

সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথাগত বিচারে পাঁচটি কাব্যকে বিশেষ সম্মান দিয়ে বলা হয় পঞ্চ মহাকাব্য। এগুলো হল:

  1. রঘুবংশ — কালিদাস। সূর্যবংশের রাজা দিলীপ থেকে অগ্নিবর্ণ পর্যন্ত বহু প্রজন্মের কাহিনি, উনিশটি সর্গে।
  2. কুমারসম্ভব — কালিদাস। শিব-পার্বতীর মিলন ও কুমার কার্তিকেয়ের জন্মের কাহিনি; প্রচলিত পাঠে সতেরোটি সর্গ, যদিও পণ্ডিতদের অনেকে মনে করেন প্রথম আটটি সর্গই কালিদাসের রচনা।
  3. কিরাতার্জুনীয় — ভারবি (আনুমানিক ষষ্ঠ শতক)। অর্জুন দিব্য অস্ত্রের জন্য তপস্যা করছেন; শিব আসেন এক কিরাত বা শিকারির বেশে, একটি বুনো শুয়োরকে কে আগে মেরেছে তা নিয়ে দুজনের লড়াই। আঠারোটি সর্গ।
  4. শিশুপালবধ — মাঘ (আনুমানিক সপ্তম-অষ্টম শতক)। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে শ্রীকৃষ্ণের হাতে অহংকারী শিশুপালের মৃত্যু। কুড়িটি সর্গ।
  5. নৈষধীয়চরিত — শ্রীহর্ষ (আনুমানিক দ্বাদশ শতক)। নল ও দময়ন্তীর প্রেম, রাজহংসের দৌত্য আর তাদের বিবাহ। বাইশটি সর্গ।

এই পাঁচ কাব্যকে নিয়ে পণ্ডিতমহলে একটি মজার শ্লোক প্রচলিত আছে, যেখানে চার কবির চার বিশেষ গুণের কথা বলা হয়েছে:

উপমা কালিদাসস্য ভারবেরর্থগৌরবম্।
দণ্ডিনঃ পদলালিত্যং মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুণাঃ॥

— প্রচলিত শ্লোক — অর্থ: উপমায় কালিদাস, অর্থের গভীরতায় ভারবি, শব্দের লালিত্যে দণ্ডী; আর মাঘের মধ্যে এই তিন গুণই আছে।

শ্লোকটি অবশ্যই কবিদের প্রশংসায় একটু অতিরঞ্জিত, কিন্তু চার কবির স্বভাব ভালোই ধরেছে। কালিদাস চিত্রকল্প আর উপমার জাদুকর; ভারবির এক-একটি পঙ্‌ক্তি যেন রাজনীতি আর জীবনবোধের সূত্র; মাঘ পাণ্ডিত্য, অলংকার আর বর্ণনার ঐশ্বর্যে ভরা। ভারবির প্রতিটি সর্গের শেষ শ্লোকে 'লক্ষ্মী' শব্দটি আর মাঘের প্রতিটি সর্গের শেষে 'শ্রী' শব্দটি ব্যবহারের রীতি বিখ্যাত — এ যেন কবিদের নিজস্ব স্বাক্ষর। শ্রীহর্ষের নৈষধ এতই জটিল আর পাণ্ডিত্যপূর্ণ যে প্রবাদ আছে — 'নৈষধং বিদ্বদৌষধম্', অর্থাৎ নৈষধ পণ্ডিতদের ওষুধ!

মহাকাব্যের ধারা অন্য ভাষায়

সংস্কৃতের বাইরেও ভারতের প্রায় প্রতিটি ভাষায় মহাকাব্যের ধারা বয়ে চলেছে। তামিলে আছে পাঁচ মহাকাব্যের ঐতিহ্য; কন্নড়, তেলুগু, অসমিয়া, ওড়িয়া, হিন্দির নানা উপভাষায় রামায়ণ-মহাভারতের নিজস্ব রূপ তৈরি হয়েছে। বাংলায় মধ্যযুগে কৃত্তিবাসের রামায়ণ ও কাশীরাম দাসের মহাভারত ঘরে ঘরে পৌঁছেছে, মঙ্গলকাব্য গেয়েছে লৌকিক দেবদেবী আর সাধারণ মানুষের সংগ্রামের কথা। উনিশ শতকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত পাশ্চাত্য মহাকাব্যের আদলে লিখলেন 'মেঘনাদবধ কাব্য'; তাঁর পরে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বৃত্রসংহার' ও নবীনচন্দ্র সেনের কাব্যত্রয়ীও এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

পাশ্চাত্যেও মহাকাব্যের দীর্ঘ ইতিহাস আছে — গ্রিসের হোমারের ইলিয়াড ও অডিসি, রোমের ভার্জিলের ঈনিড, ইতালির দান্তের ডিভাইন কমেডি, ইংল্যান্ডের মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট। মজার ব্যাপার, মধুসূদন এই সব কাব্যই মন দিয়ে পড়েছিলেন, আর তাঁর বাংলা মহাকাব্যে পুবের আর পশ্চিমের দুই ধারা এসে মিলেছে। সে গল্প আমরা ষষ্ঠ অধ্যায়ে শুনব।


এই বইয়ের পথনকশা

পরের ন'টি অধ্যায়ে আমরা একে একে যাব কালিদাসের মেঘদূত, অভিজ্ঞানশকুন্তলম্, কুমারসম্ভব আর রঘুবংশের কাছে; তারপর বাংলার মাটিতে নেমে মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য, কৃত্তিবাস ও কাশীরাম দাস, জয়দেবের গীতগোবিন্দ, চর্যাপদ ও মঙ্গলকাব্যের জগতে; শেষে দক্ষিণ ভারতের তামিল মহাকাব্য শিলপ্পদিকারম্‌ ও অন্য ভাষার মহাকাব্যের এক ঝলক দেখে বইটি শেষ করব। মনে রাখবেন, শকুন্তলা আসলে নাটক আর মেঘদূত একটি খণ্ডকাব্য — কঠোর অর্থে এরা মহাকাব্য নয়; কিন্তু ভারতের কাব্যজগতে এদের জায়গা এত উঁচু যে এদের বাদ দিয়ে কাব্যকথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রতিটি অধ্যায়ে কবির পরিচয়, কাহিনির সহজ পুনর্কথন, কাব্যের সৌন্দর্যের আলোচনা আর শেষে থাকবে একটি প্রশ্নের উত্তর — কেন আজও পড়ব?

কেন আজও পড়ব

মহাকাব্য আমাদের শেকড়ের খোঁজ দেয়। আজ আমরা যে উপমা অজান্তে ব্যবহার করি — 'চাঁদের মতো মুখ', 'পদ্মের মতো চোখ' — তার অনেকগুলোই এই কাব্যগুলো থেকে ভেসে এসেছে। মহাকাব্য শেখায় ধৈর্য: একটা বড় কাহিনিকে ধীরে ধীরে উপভোগ করতে। আর সবচেয়ে বড় কথা, মহাকাব্যের চরিত্রেরা — তাদের প্রেম, দুঃখ, অহংকার, ত্যাগ — হাজার বছর পরেও আমাদেরই মতো মানুষ। তাদের চিনলে নিজেদেরও একটু ভালো করে চেনা যায়।

🧠 Chapter quiz4 questions · pass 60%
Next →অধ্যায় ২ — কালিদাসের মেঘদূত
1 / 1