←
কাব্যকথাCh 2/10 · 5 min
Theme
Text size
Reading mode
কাব্যকথা1. অধ্যায় ১ — মহাকাব্য কাকে বলে2. অধ্যায় ২ — কালিদাসের মেঘদূত🔒 অধ্যায় ৩ — অভিজ্ঞানশকুন্তলম্🔒 অধ্যায় ৪ — কুমারসম্ভব🔒 অধ্যায় ৫ — রঘুবংশ🔒 অধ্যায় ৬ — মেঘনাদবধ কাব্য: মাইকেল মধুসূদন দত্ত🔒 অধ্যায় ৭ — কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীরাম দাসের মহাভারত🔒 অধ্যায় ৮ — গীতগোবিন্দ: জয়দেব🔒 অধ্যায় ৯ — চর্যাপদ ও মঙ্গলকাব্য🔒 অধ্যায় ১০ — তামিল ও অন্যান্য ভাষার মহাকাব্য

Log in to save highlights and notes.

Chapter 2

অধ্যায় ২ — কালিদাসের মেঘদূত

বর্ষার প্রথম মেঘ দেখলে মন কেমন করে ওঠে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। দূরে থাকা প্রিয়জনের কথা মনে পড়ে, জানলার বাইরে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে এক কবি এই অনুভূতিকে এমন এক কাব্যে বেঁধেছিলেন, যা আজও ভারতের সবচেয়ে প্রিয় প্রেমের কবিতাগুলোর একটি। কবির নাম কালিদাস, কাব্যের নাম মেঘদূত — অর্থাৎ 'মেঘ যখন দূত'।

পাহাড়চূড়ায় নেমে আসা আষাঢ়ের প্রথম মেঘ — বিরহী যক্ষের দূত
পাহাড়চূড়ায় নেমে আসা আষাঢ়ের প্রথম মেঘ — বিরহী যক্ষের দূত

কবি কালিদাস

কালিদাসকে বলা হয় সংস্কৃত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। মজার ব্যাপার, এত বড় কবির জীবন সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই নিশ্চিতভাবে জানি না। তাঁর সময় নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বহু মত আছে; অধিকাংশ গবেষক মনে করেন তিনি আনুমানিক চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীর মানুষ, গুপ্ত যুগের সমৃদ্ধির কালে তাঁর কাব্যচর্চা। প্রচলিত কিংবদন্তি তাঁকে রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার 'নবরত্ন'-এর একজন বলে, আর উজ্জয়িনী নগরীর প্রতি তাঁর বিশেষ টান মেঘদূতেই স্পষ্ট। আরেকটি জনপ্রিয় গল্পে বলা হয়, তিনি নাকি প্রথম জীবনে ছিলেন অতি মূর্খ, পরে দেবী কালীর কৃপায় মহাকবি হন — তবে এগুলো লোককথা, ইতিহাস নয়।

কালিদাসের নামে প্রচলিত প্রধান রচনাগুলো হল: তিনটি নাটক — মালবিকাগ্নিমিত্রম্, বিক্রমোর্বশীয়ম্ ও অভিজ্ঞানশকুন্তলম্; দুটি মহাকাব্য — কুমারসম্ভব ও রঘুবংশ; আর একটি খণ্ডকাব্য — মেঘদূত। ঋতুবর্ণনার কাব্য ঋতুসংহারও প্রথাগতভাবে তাঁর নামে চলে, যদিও কেউ কেউ এ নিয়ে সন্দেহ করেন।

কাহিনি: নির্বাসিত যক্ষ আর একখণ্ড মেঘ

ধনদেবতা কুবেরের রাজধানী অলকা, হিমালয়ের কৈলাস পর্বতের কোলে। সেখানে কুবেরের সেবায় নিযুক্ত ছিল এক যক্ষ। নবপরিণীতা স্ত্রীর প্রেমে বিভোর হয়ে সে একদিন নিজের দায়িত্বে অবহেলা করে বসে। ক্রুদ্ধ কুবের তাকে শাপ দিলেন — এক বছর স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে নির্বাসনে থাকতে হবে, আর তার অলৌকিক শক্তিও এই সময়ে থাকবে না।

যক্ষ এসে আশ্রয় নিল মধ্য ভারতের রামগিরি পাহাড়ের আশ্রমে — যেখানকার জলাশয় একসময় সীতার স্নানে পবিত্র হয়েছিল বলে লোকে বিশ্বাস করে। কয়েক মাস কেটে গেছে; বিরহে সে এত রোগা হয়ে গেছে যে হাতের সোনার বালা খুলে পড়ে যায়। এমন সময় আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে সে দেখল, পাহাড়ের চূড়া জড়িয়ে ধরে আছে এক বিশাল কালো মেঘ — যেন কোনো হাতি খেলাচ্ছলে মাটির ঢিবিতে দাঁত দিয়ে গুঁতো মারছে। কাব্যের এই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিটি সংস্কৃতপ্রেমীরা আজও মুখে মুখে আওড়ান:

আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং
বপ্রক্রীড়াপরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ং দদর্শ॥

— মেঘদূত — অর্থ: আষাঢ়ের প্রথম দিনে সে দেখল পাহাড়ের ঢাল জড়িয়ে থাকা এক মেঘ, যেন খেলাচ্ছলে মাটিতে দাঁত বসানো হাতির মতো দেখতে।

বর্ষা মানেই প্রিয়জনের কাছে ফেরার ঋতু। যক্ষের মনে হল, এই মেঘ তো উত্তরে যাবেই — তাহলে একে দিয়েই প্রিয়ার কাছে খবর পাঠানো যাক না কেন! কবি নিজেই হেসে বলেছেন, কামনায় আকুল মানুষ জড় আর চেতনের তফাত বোঝে না; তাই ধোঁয়া, আলো, জল আর হাওয়ায় গড়া মেঘকে যক্ষ বন্ধুর মতো সম্বোধন করল। কুটজ ফুলের অর্ঘ্য দিয়ে সে মেঘকে স্বাগত জানাল, তারপর বুঝিয়ে বলতে লাগল পথের কথা।

পূর্বমেঘ: এক অপূর্ব যাত্রাপথ

মেঘদূত দুই ভাগে বিভক্ত — পূর্বমেঘ আর উত্তরমেঘ। পূর্বমেঘে যক্ষ মেঘকে রামগিরি থেকে অলকা পর্যন্ত গোটা পথের নির্দেশ দেয়। এ যেন প্রাচীন ভারতের এক কাব্যিক মানচিত্র। মেঘ যাবে আম্রকূট পর্বতের উপর দিয়ে, যেখানে পাকা আমে ছাওয়া পাহাড় দেখাবে পৃথিবীর বুকের মতো; তারপর বিন্ধ্যের পাদদেশে দেখবে পাথরে ছড়িয়ে পড়া রেবা অর্থাৎ নর্মদাকে, যেন হাতির গায়ে আঁকা নকশা। দশার্ণ দেশের রাজধানী বিদিশা, বেত্রবতী নদীর মিষ্টি জল পেরিয়ে মেঘ একটু ঘুরপথে হলেও যেন অবশ্যই যায় উজ্জয়িনীতে — কারণ সেখানকার প্রাসাদশিখর, নাগরিকাদের চোখের চাহনি আর মহাকাল মন্দিরের সন্ধ্যারতি না দেখলে মেঘের জন্মই বৃথা!

এরপর শিপ্রা নদীর ভোরের হাওয়া, গম্ভীরা নদী, দেবগিরিতে স্কন্দের পুজো, রন্তিদেবের কীর্তির সাক্ষী চর্মণ্বতী নদী, দশপুর নগর, ব্রহ্মাবর্ত আর কুরুক্ষেত্রের রণভূমি, সরস্বতী নদী, কনখলে হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা — একে একে সব পেরিয়ে মেঘ পৌঁছবে হিমালয়ে। ক্রৌঞ্চ পাহাড়ের গিরিপথ দিয়ে উত্তরে গিয়ে কৈলাস, মানস সরোবরের সোনালি পদ্ম, আর অবশেষে কৈলাসের কোলে অলকা নগরী। কালিদাস প্রতিটি জায়গাকে এমনভাবে এঁকেছেন যে নদী হয়ে ওঠে অভিমানী নায়িকা, পাহাড় হয়ে ওঠে আতিথেয় বন্ধু, আর মেঘ নিজেই এক রসিক পথিক।

উত্তরমেঘ: অলকা আর বিরহিণী প্রিয়া

উত্তরমেঘে আমরা পৌঁছই অলকায় — যেখানে প্রাসাদগুলো মেঘেরই মতো উঁচু, মণিময় মেঝে, ছয় ঋতুর ফুল একসঙ্গে ফোটে। যক্ষ মেঘকে নিজের বাড়ি চেনায়: দরজার কাছে ইন্দ্রধনুর মতো তোরণ, উঠোনে তার স্ত্রীর হাতে লালন করা ছোট্ট মন্দার গাছ, মরকত-বাঁধানো সিঁড়ির দিঘি, আর পোষা ময়ূর।

তারপর সে কল্পনা করে প্রিয়ার অবস্থা: বিরহে সে যেন শীতের পদ্মিনীর মতো ম্লান। হয়তো সে বীণা কোলে নিয়ে স্বামীর নাম দিয়ে গান বাঁধতে বসেছে, কিন্তু চোখের জলে তার ভিজে গেছে, আর সুরও ভুলে যাচ্ছে বারবার। হয়তো বাকি দিনগুলো গোনার জন্য দরজার কাছে ফুল সাজিয়ে রাখছে। যক্ষ মেঘকে অনুরোধ করে — রাতে ঘুমন্ত প্রিয়াকে হঠাৎ গর্জনে চমকে দিও না; ধীরে, মৃদু বিদ্যুতের আলোয় জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে জানিও যে তুমি তার স্বামীর বন্ধু, খবর এনেছ।

বার্তাটি সরল কিন্তু হৃদয়ছোঁয়া: 'আমি বেঁচে আছি, তোমাকেই ভাবছি। আর মাত্র চার মাস — বিষ্ণু যখন যোগনিদ্রা থেকে জেগে উঠবেন, কার্তিকের সেই সময়ে শাপ শেষ হবে, আমরা আবার মিলিত হব। ধৈর্য ধরো।' শেষে যক্ষ মেঘকে আশীর্বাদ করে — প্রিয়া বিদ্যুতের সঙ্গে তোমার যেন কখনও এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্ছেদ না হয়।


কাব্যের সৌন্দর্য ও ছন্দ

পুরো মেঘদূত একটিমাত্র ছন্দে লেখা — মন্দাক্রান্তা। নামের মানেই 'ধীরে এগিয়ে চলা', আর ছন্দটির চালেও সত্যিই এক মন্থর, ভারী, দুলে-চলা গতি আছে — যেন জলভরা মেঘ আস্তে আস্তে আকাশ পেরোচ্ছে। বিষয় আর ছন্দের এমন মিল খুব কম কাব্যেই দেখা যায়। প্রচলিত পাঠ অনুসারে কাব্যে মোটামুটি একশো দশ থেকে একশো কুড়িটির মতো শ্লোক আছে।

বাংলা সাহিত্যেও মেঘদূতের ছায়া গভীর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'মেঘদূত' নামে কবিতা লিখেছেন, প্রবন্ধে বারবার এই কাব্যের কথা বলেছেন; তাঁর বর্ষার গানে বহুবার ফিরে এসেছে সেই বিরহী যক্ষের মন। বাংলায় মেঘদূতের অনুবাদও হয়েছে অনেক।

কেন আজও পড়ব

আজ আমাদের হাতে মোবাইল, এক মুহূর্তে দূরের মানুষের গলা শোনা যায়। তবু মেঘদূত পুরনো হয়নি, কারণ অপেক্ষার কষ্ট, প্রিয়জনকে একটু খবর পাঠানোর ব্যাকুলতা — এই অনুভূতিগুলো যন্ত্রে বদলায় না। মেঘদূত আমাদের শেখায় প্রকৃতিকে বন্ধুর মতো দেখতে, নিজের দেশের নদী-পাহাড়কে ভালোবাসতে। আর শেখায়, দুঃখের মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে নেওয়া যায়। পরের বার আষাঢ়ের প্রথম মেঘ দেখলে হয়তো আপনিও একবার মনে মনে তাকে কোনো খবর দিয়ে দেবেন।

🧠 Chapter quiz4 questions · pass 60%
🔒
Enjoying it? The rest of the book is waiting.
8 more chapters · ₹59
Get the full book
1 / 1