১. গঙ্গাপুত্র দেবব্রত ও ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা
অনেক অনেক কাল আগের কথা। হিমালয়ের কোলে এক নির্জন আশ্রমে বসে আছেন এক ঋষি — গায়ের রং মেঘের মতো কালো, মাথায় জটা, চোখে গভীর শান্তি। তাঁর নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, লোকে বলে ব্যাসদেব। যমুনার এক দ্বীপে তাঁর জন্ম, তাই ‘দ্বৈপায়ন’; আর বেদকে ভাগ করে সাজিয়েছিলেন বলে ‘বেদব্যাস’। তিনি ঠিক করলেন, এমন এক কাহিনি বলবেন যার মধ্যে থাকবে রাজা ও ঋষি, যুদ্ধ ও প্রেম, লোভ ও ত্যাগ, আর সবকিছুর ওপরে থাকবে ধর্মের প্রশ্ন — মানুষ ঠিক কী করলে ঠিক কাজ করে?
প্রচলিত কাহিনি বলে, এত বড় কাব্য মুখে মুখে বলে যাওয়া যায়, কিন্তু লিখবে কে? তখন সিদ্ধিদাতা গণেশ লিখতে রাজি হলেন, তবে শর্ত দিলেন — তাঁর লেখনী একবারও থামবে না। ব্যাসদেবও পাল্টা শর্ত দিলেন — গণেশ কোনো শ্লোকের মানে না বুঝে লিখতে পারবেন না। মাঝে মাঝে ব্যাস এমন কঠিন শ্লোক বলতেন যে গণেশকে একটু ভাবতে হত, আর সেই ফাঁকে ব্যাস পরের অংশ মনে মনে গুছিয়ে নিতেন। এই গল্পটি মূল মহাভারতের সব সংস্করণে নেই, পরে যুক্ত হয়েছে বলে অনেক পণ্ডিত মনে করেন — তবু এটি এত মধুর যে ভারতের মানুষ একে ভালোবেসে মনে রেখেছে।
যদিহাস্তি তদন্যত্র যন্নেহাস্তি ন তৎ ক্বচিৎ।
— সরল অর্থ: যা এখানে আছে, তা অন্যত্রও পাওয়া যায়; যা এখানে নেই, তা আর কোথাও নেই। — মহাভারত নিজের সম্পর্কে এমনই দাবি করে।
নদীর তীরে এক রহস্যময়ী
কুরুবংশের রাজধানী হস্তিনাপুর। সেখানকার রাজা শান্তনু — সাহসী, দয়ালু, প্রজাদের প্রিয়। একদিন শিকারে বেরিয়ে তিনি গঙ্গার তীরে এসে থমকে দাঁড়ালেন। জলের ধারে বসে আছেন এক অপরূপ নারী, যেন নদীর ঢেউ থেকেই উঠে এসেছেন। রাজা মুগ্ধ হয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।
নারী মৃদু হেসে বললেন, ‘আমি রাজি, কিন্তু একটি শর্তে। আমি কে, কোথা থেকে এসেছি — কখনো জানতে চাইবেন না। আর আমি যা-ই করি, ভালো হোক বা মন্দ, আপনি বাধা দেবেন না, কটু কথাও বলবেন না। যেদিন বাধা দেবেন, সেদিনই আমি চলে যাব।’ প্রেমে বিভোর রাজা না ভেবেই রাজি হলেন।
সুখে দিন কাটতে লাগল। তারপর জন্ম নিল প্রথম সন্তান। কিন্তু রানি নবজাতককে কোলে নিয়ে সোজা চলে গেলেন গঙ্গার ঘাটে, আর শিশুটিকে জলে ভাসিয়ে দিলেন। রাজার বুক ফেটে গেল, কিন্তু প্রতিশ্রুতির কথা মনে করে তিনি চুপ করে রইলেন। দ্বিতীয়, তৃতীয়... এভাবে সাতটি সন্তানকে রানি নদীতে বিসর্জন দিলেন। প্রতিবার রাজা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলেন।
অষ্টম সন্তান জন্মানোর পর রানি যখন আবার ঘাটের দিকে চললেন, শান্তনু আর পারলেন না। চিৎকার করে উঠলেন, ‘থামো! তুমি কেমন মা? এই শিশুটিকে অন্তত বাঁচতে দাও!’
রানি থামলেন। শান্ত গলায় বললেন, ‘মহারাজ, আজ আপনি শর্ত ভাঙলেন, তাই আমাকে যেতেই হবে। তবে শুনুন — আমি দেবী গঙ্গা। এই আট শিশু আসলে আট বসু, স্বর্গের দেবতা। একবার তাঁরা মহর্ষি বশিষ্ঠের কামধেনু নন্দিনীকে চুরি করেছিলেন, তাই ঋষির অভিশাপে মানুষ হয়ে জন্মাতে হয়েছে। আমি কথা দিয়েছিলাম, জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের মুক্তি দেব। যে বসু চুরির মূল উদ্যোগী ছিলেন, তাঁকে পৃথিবীতে দীর্ঘ জীবন কাটাতে হবে। এই সেই শিশু। আমি একে নিয়ে যাচ্ছি, বড় করে আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব।’ এই বলে দেবী শিশুকে কোলে নিয়ে জলের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

দেবব্রতের ফিরে আসা
বছরের পর বছর কেটে গেল। একদিন শান্তনু গঙ্গার ধারে গিয়ে দেখেন, নদীর জল যেন হঠাৎ কমে গেছে। এগিয়ে গিয়ে দেখলেন এক তেজস্বী যুবক তির ছুঁড়ে ছুঁড়ে গোটা নদীর স্রোত আটকে দিয়েছে! তখনই দেবী গঙ্গা আবির্ভূত হয়ে যুবকের হাত ধরে বললেন, ‘মহারাজ, এই আপনার অষ্টম পুত্র, দেবব্রত। মহর্ষি বশিষ্ঠের কাছে সে বেদ শিখেছে, দেবগুরু বৃহস্পতি ও দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কাছে নীতিশাস্ত্র, আর পরশুরামের কাছে অস্ত্রবিদ্যা। একে ঘরে নিয়ে যান।’
শান্তনুর আনন্দের সীমা রইল না। দেবব্রতকে যুবরাজ করা হল। প্রজারা দেখল, তাঁদের ভবিষ্যৎ রাজা যেমন বীর, তেমনই বিনয়ী, জ্ঞানী আর ন্যায়পরায়ণ। হস্তিনাপুরে যেন সোনালি দিন ফিরে এল।
সত্যবতী ও এক কঠিন শর্ত
চার বছর পর আবার এক মোড়। যমুনার তীরে ঘুরতে ঘুরতে শান্তনু এক মিষ্টি সুবাস পেলেন। সুবাসের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখলেন, নৌকা বাইছে এক সুন্দরী তরুণী — নাম সত্যবতী, জেলেদের রাজা দাশরাজের পালিত কন্যা। শান্তনু আবার মন হারালেন এবং দাশরাজের কাছে গিয়ে কন্যার হাত চাইলেন।
দাশরাজ বিনয়ের সঙ্গে কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন, ‘মহারাজ, মেয়ে দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু কথা দিন, সত্যবতীর গর্ভের সন্তানই হবে হস্তিনাপুরের রাজা।’ শান্তনু চুপ করে গেলেন। দেবব্রতের মতো যোগ্য ছেলেকে বঞ্চিত করার কথা তিনি ভাবতেও পারেন না। ভারী মন নিয়ে তিনি প্রাসাদে ফিরলেন, কিন্তু মুখের হাসি হারিয়ে গেল।
দেবব্রত বাবার এই বিষণ্ণতা লক্ষ করলেন। মন্ত্রীদের কাছে খোঁজ নিয়ে আসল কারণ জানতে পারলেন। তারপর কাউকে কিছু না বলে কয়েকজন বয়স্ক সভাসদকে নিয়ে নিজেই চললেন দাশরাজের কাছে।
ভীষণ প্রতিজ্ঞা — দেবব্রত হলেন ভীষ্ম
দাশরাজের সামনে দাঁড়িয়ে দেবব্রত বললেন, ‘আপনার শর্ত আমি মেনে নিলাম। আমি সিংহাসনের দাবি ত্যাগ করছি। সত্যবতীর পুত্রই রাজা হবে।’
দাশরাজ বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি বললেন, ‘যুবরাজ, আপনার কথায় আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। কিন্তু আপনার সন্তানেরা যদি ভবিষ্যতে সিংহাসন দাবি করে?’
তখন দেবব্রত আকাশের দিকে হাত তুলে এমন এক প্রতিজ্ঞা করলেন যা শুনে চারদিক স্তব্ধ হয়ে গেল: ‘আজ থেকে আমি আজীবন ব্রহ্মচারী থাকব। কখনো বিয়ে করব না, আমার কোনো সন্তান থাকবে না। আর যতদিন বাঁচব, হস্তিনাপুরের সিংহাসন ও তার রাজাকে রক্ষা করব।’
কথিত আছে, তখন আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হল, দেবতারা একসঙ্গে বলে উঠলেন — ‘ভীষ্ম! ভীষ্ম!’ অর্থাৎ যিনি ভীষণ, কঠোর প্রতিজ্ঞা করেছেন। সেদিন থেকে দেবব্রতের নাম হল ভীষ্ম। ছেলের এই ত্যাগে অভিভূত শান্তনু তাঁকে বর দিলেন — ‘তুমি যখন নিজে চাইবে, কেবল তখনই তোমার মৃত্যু হবে।’ একে বলে ইচ্ছামৃত্যু।
একটি প্রতিজ্ঞা একজন মানুষকে মহান করে, আবার সেই প্রতিজ্ঞাই তাঁকে সারাজীবন বেঁধে রাখে।
— ভীষ্মের জীবনের মূল সুর
শান্তনু ও সত্যবতীর দুই পুত্র — চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। শান্তনুর মৃত্যুর পর চিত্রাঙ্গদ রাজা হলেন, কিন্তু অল্প বয়সেই এক গন্ধর্বের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারালেন। তখন কিশোর বিচিত্রবীর্য সিংহাসনে বসলেন, আর রাজ্য চালানোর ভার ছিল ভীষ্মের কাঁধে।
বিচিত্রবীর্যের বিয়ের জন্য ভীষ্ম গেলেন কাশীরাজের তিন কন্যা — অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকার স্বয়ংবর সভায়। সেখানে সমবেত রাজাদের পরাজিত করে তিনি তিন বোনকেই রথে তুলে আনলেন। কিন্তু হস্তিনাপুরে পৌঁছে বড় বোন অম্বা জানালেন, তিনি মনে মনে শাল্বরাজকে বরণ করেছেন। ভীষ্ম সসম্মানে তাঁকে ফিরে যেতে দিলেন। কিন্তু শাল্বরাজ অম্বাকে আর গ্রহণ করলেন না। অপমানিত অম্বা ফিরে এসে ভীষ্মকে বিয়ে করতে বললেন, কিন্তু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ভীষ্ম রাজি হলেন না। অম্বার এই গভীর দুঃখ আর ক্ষোভ পরে এক নতুন জন্মে ফিরে আসবে — সে কথা বলা হবে কুরুক্ষেত্রের অধ্যায়ে।
অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে বিচিত্রবীর্যের বিয়ে হল, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি অসুখে মারা গেলেন — কোনো সন্তান রেখে যেতে পারলেন না। কুরুবংশ যেন নিভে যেতে বসল। সত্যবতী কাতর হয়ে ভীষ্মকে বললেন, ‘এবার তুমি প্রতিজ্ঞা ভাঙো, বংশ রক্ষা করো।’ ভীষ্ম নরম অথচ অটল গলায় বললেন, ‘মা, সূর্য তার আলো ছাড়তে পারে, আগুন তার উত্তাপ ছাড়তে পারে, কিন্তু আমি আমার কথা ছাড়তে পারি না।’
তখন সত্যবতী এক গোপন কথা প্রকাশ করলেন। বিয়ের আগে মহর্ষি পরাশরের আশীর্বাদে তাঁর এক পুত্র হয়েছিল — সেই পুত্রই ব্যাসদেব! মায়ের ডাকে ব্যাস এলেন, আর তাঁর আশীর্বাদেই প্রাচীন রীতি অনুযায়ী জন্ম নিল কুরুবংশের পরের প্রজন্ম। অর্থাৎ যিনি মহাভারত রচনা করেছেন, তিনি নিজেই এই কাহিনির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র — এমন আশ্চর্য ব্যাপার পৃথিবীর খুব কম মহাকাব্যে আছে।
- শান্তনু — হস্তিনাপুরের রাজা, ভীষ্মের পিতা
- গঙ্গা — দেবী, ভীষ্মের মাতা
- দেবব্রত / ভীষ্ম — আজীবন ব্রহ্মচর্যের প্রতিজ্ঞাকারী, কুরুবংশের অভিভাবক
- সত্যবতী — শান্তনুর দ্বিতীয় স্ত্রী, ব্যাসদেবের মাতা
- অম্বা, অম্বিকা, অম্বালিকা — কাশীর তিন রাজকন্যা
এভাবেই এক পুত্রের ত্যাগের মধ্যে দিয়ে শুরু হল মহাভারতের মহাকাহিনি। ভীষ্ম সিংহাসন ছাড়লেন, সংসার ছাড়লেন, কিন্তু কুরুবংশের দায়িত্ব ছাড়লেন না। পরের অধ্যায়ে আমরা দেখব, তাঁর চোখের সামনেই বড় হয়ে উঠছে দুই দল ভাই — কৌরব আর পাণ্ডব — যাদের শৈশবের খেলাধুলোর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের মহাযুদ্ধের বীজ।