←
মহাভারত — সহজ কথায়Ch 2/12 · 5 min
Theme
Text size
Reading mode
মহাভারত — সহজ কথায়1. ১. গঙ্গাপুত্র দেবব্রত ও ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা2. ২. কুরু-পাণ্ডবের জন্ম ও দ্রোণাচার্যের পাঠশালা🔒 ৩. কর্ণের পরিচয় ও জতুগৃহ🔒 ৪. দ্রৌপদীর স্বয়ংবর🔒 ৫. ইন্দ্রপ্রস্থ ও রাজসূয় যজ্ঞ🔒 ৬. পাশাখেলা ও দ্রৌপদীর অপমান🔒 ৭. বনবাস — যক্ষপ্রশ্ন ও অর্জুনের অস্ত্রলাভ🔒 ৮. অজ্ঞাতবাস — বিরাট রাজ্যে🔒 ৯. শান্তির চেষ্টা — কৃষ্ণের দৌত্য, কর্ণ-কুন্তী সংবাদ🔒 ১০. কুরুক্ষেত্র — গীতার বাণী ও ভীষ্মের শরশয্যা🔒 ১১. অভিমন্যু, কর্ণ ও দুর্যোধনের পতন🔒 ১২. যুদ্ধের পরে — যুধিষ্ঠিরের রাজ্য, মহাপ্রস্থান ও মহাভারতের শিক্ষা

Log in to save highlights and notes.

Chapter 2

২. কুরু-পাণ্ডবের জন্ম ও দ্রোণাচার্যের পাঠশালা

ব্যাসদেবের আশীর্বাদে কুরুবংশে জন্ম নিলেন তিন রাজকুমার। অম্বিকার পুত্র ধৃতরাষ্ট্র — জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন, কিন্তু অসম্ভব শারীরিক শক্তির অধিকারী। অম্বালিকার পুত্র পাণ্ডু — গায়ের রং কিছুটা ফ্যাকাশে, তাই নাম পাণ্ডু, কিন্তু তিনি ছিলেন দক্ষ যোদ্ধা। আর রাজপ্রাসাদের এক দাসীর গর্ভে জন্ম নিলেন বিদুর — তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ও ধর্মনিষ্ঠ। মহাভারত বলে, বিদুর ছিলেন স্বয়ং ধর্মদেবের অংশ।

বড় ভাই ধৃতরাষ্ট্র দৃষ্টিহীন বলে সেকালের নিয়মে রাজা হলেন পাণ্ডু। ধৃতরাষ্ট্র মেনে নিলেন, কিন্তু মনের গভীরে একটা কাঁটা রয়ে গেল — ‘আমি বড়, তবু সিংহাসন আমার নয়।’ এই কাঁটাই পরে তাঁর ছেলেদের মনে বিশাল গাছ হয়ে উঠবে।

ধৃতরাষ্ট্রের বিয়ে হল গান্ধাররাজের কন্যা গান্ধারীর সঙ্গে। স্বামী দেখতে পান না জেনে গান্ধারী নিজের চোখ কাপড়ে বেঁধে নিলেন, আর সারাজীবন সেই বাঁধন খোলেননি। তাঁর সঙ্গে হস্তিনাপুরে এলেন তাঁর ভাই শকুনি — যাঁর চতুর বুদ্ধি পরে অনেক অনর্থের কারণ হবে।

পাণ্ডু বিয়ে করলেন দুজনকে — যদুবংশের কন্যা কুন্তী, যিনি ছিলেন কৃষ্ণের পিসি, আর মদ্ররাজের কন্যা মাদ্রী। পাণ্ডু দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে বহু রাজ্য জয় করলেন। তারপর রাজ্যের ভার দাদার হাতে দিয়ে দুই রানিকে নিয়ে বনে গেলেন কিছুদিন বিশ্রাম ও শিকারের জন্য।

সেখানেই ঘটল এক দুর্ঘটনা। পাণ্ডু হরিণ ভেবে তির ছুঁড়লেন, কিন্তু সেটি ছিলেন হরিণরূপী এক ঋষি, কিন্দম। মৃত্যুর আগে ঋষি অভিশাপ দিলেন — পাণ্ডু যদি স্ত্রীর কাছে যান, তাঁর মৃত্যু হবে। দুঃখে ভেঙে পড়লেন পাণ্ডু। সন্তান ছাড়া বংশ রক্ষা হবে কী করে?

দেবতাদের আশীর্বাদে পাঁচ ভাই

তখন কুন্তী জানালেন এক গোপন কথা। ছোটবেলায় তিনি মহর্ষি দুর্বাসার খুব সেবা করেছিলেন। খুশি হয়ে ঋষি তাঁকে একটি মন্ত্র দিয়েছিলেন, যা উচ্চারণ করলে যে কোনো দেবতা এসে তাঁকে সন্তানের আশীর্বাদ দেবেন। পাণ্ডুর অনুমতিতে কুন্তী প্রথমে ডাকলেন ধর্মদেবকে — জন্ম নিলেন যুধিষ্ঠির, সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক। তারপর বায়ুদেবের আশীর্বাদে ভীম, অসীম শক্তির অধিকারী। দেবরাজ ইন্দ্রের আশীর্বাদে অর্জুন, ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। কুন্তী মন্ত্রটি মাদ্রীকেও শিখিয়ে দিলেন; মাদ্রী ডাকলেন যমজ দেবতা অশ্বিনীকুমারদের — জন্ম নিলেন যমজ নকুল ও সহদেব। এই পাঁচজনই পঞ্চপাণ্ডব।

অন্যদিকে গান্ধারীর একশো পুত্র ও এক কন্যা। মহাভারতের বর্ণনা অদ্ভুত — গান্ধারীর গর্ভ থেকে জন্মেছিল একটি মাংসপিণ্ড, ব্যাসদেব সেটিকে একশো এক ভাগে ভাগ করে ঘিয়ের পাত্রে রেখে দেন, আর তা থেকেই জন্ম নেন দুর্যোধন, দুঃশাসনসহ একশো ভাই ও বোন দুঃশলা। বড় ছেলে দুর্যোধনের জন্মের সময় চারদিকে নাকি অশুভ লক্ষণ দেখা দিয়েছিল, বিদুর তাকে ত্যাগ করার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন বাবা তা পারে? ধৃতরাষ্ট্র ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন।

কয়েক বছর পর বসন্তের এক দিনে পাণ্ডু অভিশাপের কথা ভুলে মাদ্রীর কাছে গেলেন, আর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হল। শোকে মাদ্রী স্বামীর সঙ্গে চলে গেলেন, তাঁর দুই শিশুপুত্রের দায়িত্ব দিয়ে গেলেন কুন্তীকে। ঋষিরা কুন্তী আর পাঁচ শিশুকে হস্তিনাপুরে পৌঁছে দিলেন।

হস্তিনাপুরের প্রাসাদে একশো পাঁচ জন রাজকুমার একসঙ্গে বড় হতে লাগল। খেলায়, দৌড়ে, গাছে চড়ায় ভীম সবাইকে হারিয়ে দিত — কখনো দশ জন কৌরবকে একসঙ্গে জলে চুবিয়ে দিত, কখনো গাছ ঝাঁকিয়ে ফল সমেত তাদের মাটিতে ফেলত। দুষ্টুমি ছিল, কিন্তু তার মধ্যে বিদ্বেষ ছিল না। দুর্যোধনের মনে কিন্তু জমতে লাগল ক্ষোভ আর ভয়।

একদিন নদীর ধারে আনন্দ-ভোজের আয়োজন হল। দুর্যোধন ভীমের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিল, আর অজ্ঞান ভীমকে লতায় বেঁধে জলে ফেলে দিল। কিন্তু ভীম পৌঁছে গেলেন নাগলোকে। সেখানে নাগরাজ বাসুকি তাঁকে চিনতে পারলেন, অমৃতরসের মতো শক্তিবর্ধক পানীয় খাইয়ে আরও শক্তিশালী করে ফেরত পাঠালেন। কুন্তী ও বিদুর বুঝলেন, এই প্রাসাদে সাবধানে থাকতে হবে।

দ্রোণাচার্যের পাঠশালায় চলছে ধনুর্বিদ্যার অনুশীলন
দ্রোণাচার্যের পাঠশালায় চলছে ধনুর্বিদ্যার অনুশীলন

কূপের মধ্যে বল ও দ্রোণাচার্যের আগমন

রাজকুমারদের প্রথম অস্ত্রগুরু ছিলেন কৃপাচার্য। একদিন ছেলেরা খেলতে গিয়ে দেখে তাদের কাঠের বল একটা শুকনো কুয়োর মধ্যে পড়ে গেছে। কেউ তুলতে পারছে না। তখন এক রোগা, শ্যামবর্ণ ব্রাহ্মণ এগিয়ে এলেন। হেসে বললেন, ‘তোমরা ক্ষত্রিয়ের ছেলে, একটা বল তুলতে পারছ না?’ তারপর একগোছা ঘাসের শীষ নিয়ে মন্ত্র পড়ে একটির পর একটি ছুঁড়ে দিলেন — প্রথমটি বিঁধল বলে, দ্বিতীয়টি প্রথমটির পেছনে, এভাবে এক লম্বা শিকল তৈরি হল, আর বলটি উঠে এল!

ছেলেরা ছুটে গিয়ে ভীষ্মকে খবর দিল। ভীষ্ম বুঝলেন, ইনি স্বয়ং দ্রোণ — ভরদ্বাজ মুনির পুত্র, পরশুরামের শিষ্য, অস্ত্রবিদ্যায় অদ্বিতীয়। দ্রোণ জানালেন তাঁর দুঃখের কাহিনি: ছোটবেলার বন্ধু পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ একসময় বলেছিলেন, রাজা হলে অর্ধেক রাজ্য দেবেন। কিন্তু দারিদ্র্যের দিনে দ্রোণ যখন সাহায্য চাইতে গেলেন, দ্রুপদ তাঁকে সভায় অপমান করে বললেন, ‘রাজা আর গরিবের বন্ধুত্ব হয় না।’ সেই অপমানের জ্বালা দ্রোণ ভোলেননি। ভীষ্ম তাঁকে সসম্মানে রাজকুমারদের আচার্য নিযুক্ত করলেন।

পাখির চোখ — অর্জুনের একাগ্রতা

দ্রোণাচার্যের পাঠশালায় সবাই শিখতে লাগল — গদা, তলোয়ার, রথচালনা, ধনুর্বিদ্যা। ভীম আর দুর্যোধন গদায় পারদর্শী হল, নকুল-সহদেব তলোয়ারে, যুধিষ্ঠির রথযুদ্ধে। কিন্তু অর্জুনের নিষ্ঠা ছিল আলাদা। একবার অন্ধকারে খেতে বসে বাতাসে প্রদীপ নিভে গেলে অর্জুন দেখলেন, হাত অন্ধকারেও ঠিক মুখে পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি বুঝলেন, অভ্যাস থাকলে অন্ধকারেও তির চালানো যায় — সেই রাত থেকেই শুরু করলেন অন্ধকারে অনুশীলন।

একদিন দ্রোণ গাছের ডালে একটা কাঠের পাখি বসিয়ে পরীক্ষা নিলেন। একে একে শিষ্যদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী দেখছ?’ যুধিষ্ঠির বললেন, ‘গাছ, ডাল, পাখি, আপনাকে, ভাইদের...’ দ্রোণ বললেন, ‘সরে যাও।’ সবাই প্রায় একই উত্তর দিল। অর্জুনের পালা এলে তিনি বললেন, ‘আমি শুধু পাখিটির চোখ দেখছি, গুরুদেব।’ দ্রোণ বললেন, ‘ছোঁড়ো।’ তির গিয়ে বিঁধল ঠিক চোখে। গুরু খুশি হয়ে বললেন, ‘তোমার চেয়ে বড় ধনুর্ধর আমি কাউকে হতে দেব না।’

একলব্য — নীরব শিষ্যের কাহিনি

কিন্তু এই প্রতিশ্রুতিই জন্ম দিল মহাভারতের সবচেয়ে বেদনাদায়ক গল্পগুলোর একটি। নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর ছেলে একলব্য দ্রোণের কাছে ধনুর্বিদ্যা শিখতে এসেছিল। দ্রোণ তাকে ফিরিয়ে দিলেন — রাজকুমারদের পাঠশালায় এক নিষাদ বালককে তিনি নিতে পারবেন না। একলব্য রাগ করল না। বনে ফিরে মাটি দিয়ে দ্রোণের একটি মূর্তি গড়ল, আর সেই মূর্তিকে গুরু মেনে দিনরাত একা অনুশীলন করতে লাগল।

একদিন কৌরব-পাণ্ডবেরা শিকারে গেছে, সঙ্গে একটি কুকুর। কুকুরটি বনের মধ্যে একলব্যকে দেখে ঘেউ ঘেউ করতেই একলব্য পরপর সাতটি তির ছুঁড়ে কুকুরটির মুখ বন্ধ করে দিল — অথচ কুকুরের গায়ে একটুও আঘাত লাগল না! এমন সূক্ষ্ম হাত দেখে অর্জুন স্তম্ভিত। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এ বালক দ্রোণেরই শিষ্য।

অর্জুন দুঃখ নিয়ে গুরুকে বললেন, ‘আপনি তো বলেছিলেন আমার চেয়ে বড় কেউ হবে না।’ দ্রোণ অর্জুনকে নিয়ে গেলেন একলব্যের কাছে। একলব্য গুরুকে দেখে আনন্দে প্রণাম করল। দ্রোণ বললেন, ‘তুমি যদি আমার শিষ্য হও, গুরুদক্ষিণা দাও।’ একলব্য বলল, ‘যা চাইবেন, তাই দেব।’ দ্রোণ চাইলেন তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল। একলব্য এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে আঙুলটি গুরুর পায়ে রাখল।

গুরু তাকে কিছুই শেখাননি, তবু সে গুরুকে সবকিছু দিয়ে দিল।

— একলব্যের ভক্তি — যুগ যুগ ধরে মানুষকে ভাবিয়েছে

এই গল্প আজও আমাদের প্রশ্ন করে। একদিকে একলব্যের অপূর্ব নিষ্ঠা আর ভক্তি — যে শিক্ষার্থী নিজের চেষ্টায় শ্রেষ্ঠ হতে পারে। অন্যদিকে দ্রোণের সিদ্ধান্ত — প্রিয় শিষ্যকে দেওয়া কথা রাখতে গিয়ে তিনি কি অন্যায় করলেন না? মহাভারত সরাসরি রায় দেয় না; পাঠককেই ভাবতে বলে। এটাই এই মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য — এখানে কেউ পুরোপুরি সাদা বা কালো নয়।

দ্রোণের নিজের ছেলে অশ্বত্থামাও এই পাঠশালায় পড়ত। আর তাঁর শিক্ষা শেষ হলে আসবে সেই বিখ্যাত দিন, যেদিন রাজকুমারেরা সবার সামনে তাঁদের বিদ্যা দেখাবেন — আর সেই রঙ্গভূমিতে হঠাৎ প্রবেশ করবেন এক অচেনা, তেজস্বী যুবক।

🧠 Chapter quiz4 questions · pass 60%
🔒
Enjoying it? The rest of the book is waiting.
10 more chapters · ₹79
Get the full book
1 / 1