প্রথম অধ্যায় — জলঙ্গীর পাড়ে
ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ফোটেনি। জলঙ্গীর বুকের ওপর একটা পাতলা কুয়াশার চাদর বিছিয়ে আছে, যেন নদীটা এখনও ঘুম থেকে উঠতে চাইছে না। চরমাধবপুর গ্রামের শেষ মাথায়, বাঁশঝাড়ের আড়ালে বসাকবাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে মিতালি সেই কুয়াশার দিকে তাকিয়ে ছিল। আজ সে কলকাতা যাবে। শুধু বেড়াতে নয়, থাকতে। পড়তে। এই কথাটা মনে মনে যতবার বলছিল, ততবার বুকের ভেতর কোথাও একটা অদ্ভুত টান লাগছিল — আনন্দের, না ভয়ের, ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না।
উঠোনের এক পাশে টিনের চালের লম্বা ঘরটা থেকে খটাখট শব্দ আসছিল। তাঁতঘর। মিতালির জন্মের আগে থেকেই এই শব্দ এ বাড়ির হৃৎস্পন্দন। বাবা অমল বসাক ভোর না হতেই তাঁতে বসে যান — আজও বসেছেন, মেয়ে চলে যাবে বলে নিজের অস্থিরতা ঢাকতেই হয়তো। মিতালি পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজায় দাঁড়াল। ভেতরে আধো-অন্ধকার, মাকুটা এদিক থেকে ওদিক ছুটছে, টানা আর পোড়েনের সুতো মিলে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে একটা লালপাড় শাড়ি।
“বাবা, চা খাবে না?”
অমল মুখ না তুলেই বললেন, “এই আঁচলটা শেষ করে নিই। তোর মা ডাকলেই উঠব।” তারপর একটু থেমে, “ব্যাগে সব নিয়েছিস তো? সার্টিফিকেটগুলো আলাদা প্লাস্টিকে রেখেছিস?”
“তিনবার দেখেছি।”
“চারবার দেখিস।” বাবার গলায় হাসির আভাস, কিন্তু চোখ দুটো তাঁতের দিকেই। মিতালি জানে, বাবা কাঁদতে পারেন না বলেই এত কাজ করেন।
তাঁতঘরের গন্ধ
তাঁতঘরের গন্ধটা মিতালির কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে চেনা গন্ধ। মাড় দেওয়া সুতোর গন্ধ, পুরনো কাঠের গন্ধ, আর কোণের দিকে রাখা কেরোসিনের লম্ফের গন্ধ মিলে একটা আলাদা জগৎ। ছোটবেলায় সে এই ঘরের মেঝেতে বসে সুতোর গুটি নিয়ে খেলত, আর ঠাকুমা কমলাবালা পাশের তাঁতে বসে গুনগুন করে গান গাইতেন। ঠাকুমার কথা মনে পড়লেই মিতালির চোখে ভেসে ওঠে সাদা থান, কপালে চন্দনের টিপের মতো একটা ফিকে দাগ, আর আঙুলগুলো — সরু, লম্বা, সুতোর ওপর দিয়ে এমনভাবে চলত যেন বাজনা বাজাচ্ছেন।
ঠাকুমা মারা গেছেন মিতালির যখন সাত বছর বয়স। তবু কিছু কিছু ছবি মনে গেঁথে আছে। একবার ঠাকুমা তাকে কোলে বসিয়ে একটা খাতা দেখিয়েছিলেন — হলুদ হয়ে যাওয়া পাতায় পেনসিলে আঁকা নানা রকম নকশা। পদ্ম, মাছ, ধানের শিষ, আর একটা নকশা যেটা দেখতে ঠিক নদীর ঢেউয়ের মতো। ঠাকুমা বলেছিলেন, “এগুলো সব আমার মনের কথা, বুঝলি দিদিভাই। কাউকে বলতে পারিনি, তাই সুতোয় বুনে রেখেছি।” সেই খাতাটা পরে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। মা বলেছিলেন, হয়তো শ্রাদ্ধের সময় পুরনো জিনিসের সঙ্গে কোথাও চলে গেছে।
“মিতু! চা জুড়িয়ে জল হয়ে গেল যে!” রান্নাঘর থেকে মা সুধার গলা ভেসে এল।
মিতালি ফিরে গেল। রান্নাঘরের দাওয়ায় পিঁড়ি পেতে বসে ছোট ভাই টুবাই মুড়ি চিবোচ্ছে। ক্লাস নাইনে পড়ে, কিন্তু ভাবখানা এমন যেন সে-ই বাড়ির কর্তা। দিদিকে দেখেই বলল, “কলকাতায় গিয়ে আমাকে ভুলে যাবি না তো? আমার জন্য একটা ক্রিকেট ব্যাট আনবি। আসল উইলোর।”
“আগে নিজের অঙ্কের খাতা ঠিক কর, তারপর উইলো।” মিতালি ভাইয়ের মাথায় একটা চাঁটি মেরে বসে পড়ল।
মা পাশে এসে বসলেন। হাতে একটা ছোট পুঁটুলি। “এতে নারকেল নাড়ু আছে। রমাদিকে দিস। আর এই কৌটোয় আমের আচার — তোর জন্য, কাউকে দিবি না।” মায়ের গলা ধরা ধরা। মিতালি কিছু না বলে মায়ের কাঁধে মাথা রাখল। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। দূরে কোথাও একটা দোয়েল শিস দিচ্ছিল।
রমা পিসি
রমা পিসি বাবার দিদি। কলকাতার উত্তরে, বাগবাজারের কাছে একটা পুরনো বাড়িতে থাকেন। স্বামী মারা গেছেন অনেক বছর আগে, ছেলেমেয়ে নেই। মিতালি পিসিকে খুব কমই দেখেছে — বছর পাঁচেক আগে একবার পিসি এসেছিলেন ঠাকুরদার শ্রাদ্ধে, দু-দিন থেকে চলে গিয়েছিলেন। মিতালির মনে আছে, পিসি গ্রামে এসে কারও সঙ্গে বেশি কথা বলেননি। শুধু তাঁতঘরের দরজায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর ঠাকুমার পুরনো তাঁতটার গায়ে হাত বুলিয়েছিলেন, যেন কোনো জীবন্ত মানুষকে ছুঁয়ে দেখছেন।
এই পিসির বাড়িতেই এখন থেকে মিতালি থাকবে। কলকাতার কলেজে অর্থনীতিতে অনার্স পড়ার সুযোগ পেয়েছে সে। গ্রামের স্কুল থেকে এত ভালো নম্বর আগে কেউ পায়নি — হেডমাস্টারমশাই নিজে বাড়ি এসে মিষ্টি খাইয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু হস্টেলের খরচ বাবা জোগাতে পারবেন না, সেটা মিতালি জানত। তখন বাবা অনেক দ্বিধা নিয়ে দিদিকে ফোন করেছিলেন। মিতালি পাশের ঘর থেকে শুনেছিল, বাবা খুব আস্তে আস্তে কথা বলছেন, যেন কোনো পুরনো ক্ষতের ওপর পা ফেলছেন সাবধানে। ফোন রেখে বাবা শুধু বলেছিলেন, “দিদি রাজি। বলেছে, মেয়েকে পাঠিয়ে দে।”
তবু মিতালির মনে একটা প্রশ্ন রয়ে গিয়েছিল। পিসি গ্রামে আসেন না কেন? ঠাকুরদা বেঁচে থাকতে নাকি পিসির নামই উচ্চারণ করা বারণ ছিল এ বাড়িতে। কেন? মা একবার শুধু বলেছিলেন, “পুরনো কথা, মিতু। বড়দের ব্যাপার।” এর বেশি কেউ কিছু বলেনি।

বিদায়ের ঘাট
সকাল আটটার মধ্যে বেরিয়ে পড়তে হবে। কৃষ্ণনগর থেকে শিয়ালদার লোকাল ধরতে হবে, তার আগে গ্রাম থেকে ভ্যানরিকশায় খেয়াঘাট, তারপর নৌকায় নদী পার, তারপর বাস। বাবা সঙ্গে যাবেন কলকাতা পর্যন্ত, পৌঁছে দিয়ে রাতের ট্রেনে ফিরবেন।
খেয়াঘাটে পৌঁছে মিতালি দেখল, পাড়ার অনেকেই জড়ো হয়েছে। মুদির দোকানের হারুকাকা, পাশের বাড়ির বিনুদি, তার স্কুলের বন্ধু শম্পা। শম্পা মিতালির হাত ধরে বলল, “শহরে গিয়ে বড় মানুষ হয়ে যাবি, তারপর আর চিনবি না।”
“চিনব না মানে? প্রত্যেক পুজোয় আসব।” মিতালি হাসল, কিন্তু গলাটা কেঁপে গেল।
হারুকাকা অমলের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “অমল, মহাজনের টাকাটার কী হল? সে তো গতকালও খোঁজ নিচ্ছিল।”
বাবার মুখটা এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। “হবে, হারুদা। এ মাসে কলকাতার দোকান থেকে টাকা আসার কথা।” কথাটা বলেই বাবা মেয়ের দিকে তাকালেন, যেন দেখতে চাইলেন মিতালি শুনেছে কি না।
মিতালি শুনেছিল। সে জানত, গত দু-বছর ধরে বাবার ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। শান্তিপুর আর ফুলিয়ার বড় বড় পাওয়ারলুমের কাপড় সস্তায় বাজার ভরিয়ে দিচ্ছে। হাতে বোনা শাড়ির দাম দিতে চায় না কেউ। আগে বাড়ির তাঁতঘরে চারটে তাঁত চলত, এখন চলে দুটো। দুজন কারিগর কাজ ছেড়ে সুরাটে চলে গেছে। মিতালি এসব জানত, কিন্তু কেউ তাকে কিছু বলত না — যেন সে এখনও ছোট, যেন না জানলেই সমস্যাটা মিলিয়ে যাবে।
নৌকা ছাড়ল। শম্ভু মাঝি বৈঠা ফেলতেই জলের ওপর ছোট ছোট ঘূর্ণি উঠল। মিতালি পেছন ফিরে তাকাল। ঘাটের ওপর মা দাঁড়িয়ে আছেন, আঁচলটা মুখে চাপা। টুবাই হাত নাড়ছে জোরে জোরে। তাদের পেছনে বাঁশঝাড়, তার পেছনে আকাশ — বিরাট, নীল, নির্মেঘ। মিতালি মনে মনে বলল, এই আকাশটা মনে রাখব। যেখানেই যাই, এই আকাশের নিচেই তো ফিরে আসব।
নদীর মাঝখানে এসে বাবা হঠাৎ বললেন, “জানিস, তোর ঠাকুমাও একবার এই ঘাট থেকে কলকাতা গিয়েছিলেন। একবারই। তোর পিসির বিয়ের পরে।”
মিতালি অবাক হয়ে তাকাল। “তাই? কেন গিয়েছিলেন?”
বাবা অনেকক্ষণ জলের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “জানি না রে। ফিরে এসে কাউকে কিছু বলেননি। শুধু সেই রাতে অনেকক্ষণ তাঁত চালিয়েছিলেন। আমি তখন তোর টুবাইয়ের মতো বয়সের। মনে আছে, শব্দটা থামেনি সারারাত।”
কথাটা মিতালির মনে কোথাও আটকে গেল, যেমন সুতোয় গিঁট পড়ে যায়। সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। নৌকা ওপারে ভিড়ল। সামনে লম্বা রাস্তা, ট্রেন, শহর, অচেনা জীবন। আর পেছনে, নদীর ওপারে, তাঁতঘরের সেই খটাখট শব্দ — যেটা এখন আর শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু মিতালির বুকের ভেতর বাজতেই থাকল।
যে সুতো একবার টানা হয়ে গেছে তাঁতে, সে যত দূরেই যাক, কাপড়ের সঙ্গেই বাঁধা থাকে।
— — কমলাবালা বসাকের কথা, মিতালির স্মৃতিতে