দ্বিতীয় অধ্যায় — ট্রামলাইনের ধারের বাড়ি
শিয়ালদা স্টেশনে নেমে মিতালির প্রথম মনে হল, পৃথিবীর সব মানুষ যেন একসঙ্গে কোথাও যাওয়ার জন্য ছুটছে, আর কেউ কাউকে দেখছে না। কুলির হাঁক, হকারের চিৎকার, মাইকে ট্রেনের ঘোষণা, ভিড়ের ঠেলাঠেলি — সব মিলে একটা বিরাট ঢেউ, যার মধ্যে সে আর বাবা দুটো ছোট্ট নৌকার মতো ভেসে চলেছে। বাবা তার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন, যেমন ছোটবেলায় রথের মেলায় ধরতেন।
বাসে চেপে তারা উত্তরের দিকে চলল। জানলা দিয়ে মিতালি দেখছিল পুরনো বাড়ির সারি, বারান্দায় ঝোলানো কাপড়, দেয়ালে সিনেমার পোস্টার, রাস্তার ধারে ভাঁড়ের চায়ের দোকান। সবকিছুই যেন একটু জীর্ণ, একটু ক্লান্ত, অথচ অদ্ভুতভাবে জীবন্ত। শ্যামবাজারের মোড়ে নেতাজির ঘোড়সওয়ার মূর্তি দেখে সে বাবার দিকে তাকাল। বাবা হেসে বললেন, “এটা পাঁচমাথার মোড়। এখান থেকে পাঁচটা রাস্তা পাঁচদিকে গেছে। হারিয়ে গেলে এখানে এসে দাঁড়াবি, ঠিক পথ খুঁজে পাবি।”
পুরনো বাড়ি, পুরনো ঘণ্টা
রমা পিসির বাড়িটা একটা সরু গলির মুখে, বড় রাস্তার একেবারে ধারে। রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে ট্রামলাইন — দুটো চকচকে লোহার রেখা, ওপরে মাকড়সার জালের মতো তার। বাড়িটা তিনতলা, কিন্তু দেখে মনে হয় বয়সের ভারে একটু ঝুঁকে পড়েছে। সবুজ রং চটে গেছে জায়গায় জায়গায়, কার্নিশে একটা বটের চারা মাথা তুলেছে, দোতলার বারান্দায় লোহার কারুকাজ করা রেলিং। সদর দরজাটা ভারী কাঠের, তাতে পিতলের কড়া।
বাবা কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে একটা পরিষ্কার, একটু কড়া গলা ভেসে এল, “খোলা আছে। ঠেলে ঢোক।”
দরজা ঠেলে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা, ছায়াঘেরা উঠোন। মাঝখানে তুলসীমঞ্চ, এক কোণে পুরনো টিউবওয়েল, দেয়াল বেয়ে উঠেছে মানিপ্ল্যান্ট। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন রমা পিসি — ছিপছিপে, সোজা শিরদাঁড়া, সাদা খোলের শাড়ির পাড়ে সরু নীল রেখা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু খোঁপাটা নিখুঁত।
“এসেছিস তাহলে।” পিসি বাবার দিকে তাকালেন। কয়েক মুহূর্ত দুই ভাইবোন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। মিতালির মনে হল, এই নীরবতার মধ্যে অনেক বছরের অনেক না-বলা কথা জমে আছে। তারপর পিসি একটু নরম গলায় বললেন, “রোগা হয়ে গেছিস, অমল।”
বাবা মাথা নিচু করে হাসলেন। “বয়স হচ্ছে, দিদি।”
পিসি এবার মিতালির দিকে ফিরলেন। চশমার ওপর দিয়ে ভালো করে দেখলেন, যেন একটা কাপড়ের বুনোট পরখ করছেন। “তুই মিতালি। মায়ের মতো চোখ পেয়েছিস। আমার মায়ের মতো।” বলেই যেন নিজের কথায় নিজেই একটু থমকে গেলেন। তারপর তাড়াতাড়ি বললেন, “যা, হাত-মুখ ধুয়ে আয়। ভাত বাড়ছি।”

পিসির নিয়ম
দুপুরে খাওয়ার পর বাবা ফিরে গেলেন। স্টেশনে যাওয়ার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে মিতালির মাথায় হাত রাখলেন। কিছু বললেন না, শুধু হাতটা একটু বেশিক্ষণ রাখলেন। তারপর পিসির দিকে তাকিয়ে বললেন, “দিদি, ওকে দেখো।” পিসি শুধু মাথা নাড়লেন। বাবা চলে যাওয়ার পর মিতালি অনেকক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। গলির মোড়ে বাবার পিঠটা মিলিয়ে গেল, আর ঠিক তখনই রাস্তা দিয়ে একটা ট্রাম চলে গেল — টুং টুং করে ঘণ্টা বাজিয়ে, ধীর, প্রাচীন, যেন কোনো বুড়ো মানুষ লাঠি ঠুকে হেঁটে যাচ্ছেন।
সন্ধেবেলা পিসি তাকে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখালেন। দোতলায় পিসির ঘর আর একটা বসার ঘর, যেখানে কাচের আলমারিতে সারি সারি বই আর একটা পুরনো গ্রামোফোন। তিনতলায় চিলেকোঠার পাশে একটা ছোট ঘর — সেটাই এখন থেকে মিতালির। ঘরে একটা তক্তপোশ, একটা কাঠের টেবিল, আর একটা জানলা, যেটা খুললেই নিচে ট্রামলাইন দেখা যায়।
“এ ঘরে তোর পিসেমশাই বসে খাতা দেখতেন,” পিসি বললেন। “স্কুলে অঙ্ক পড়াতেন। খুব শান্ত মানুষ ছিলেন।” পিসির গলায় কোনো আবেগ নেই, শুধু তথ্য। কিন্তু মিতালি লক্ষ করল, কথাটা বলার সময় পিসি টেবিলের কোণটা আঙুল দিয়ে একবার ছুঁয়ে নিলেন।
তারপর পিসি নিয়মগুলো বলে দিলেন — স্পষ্ট, গোছানো, যেমন করে স্কুলের দিদিমণিরা বলেন। সকাল সাতটায় চা। রাত ন’টার মধ্যে বাড়ি ফেরা, দেরি হলে আগে ফোন। নিজের জামাকাপড় নিজে কাচতে হবে। আর রবিবার সকালে বাজারে যেতে হবে পিসির সঙ্গে। “শহরে থাকতে গেলে শহরটাকে চিনতে হয়,” পিসি বললেন। “আর শহর চেনার সবচেয়ে ভালো জায়গা হল বাজার।”
মিতালি সব মেনে নিল। কিন্তু মনে মনে ভাবল, এই মানুষটা কি কখনো হাসেন?
রাতের খাওয়া হল বসার ঘরের পাশে ছোট্ট খাবার-ঘরে, একটা গোল কাঠের টেবিলে। পিসি রেঁধেছিলেন মুসুরির ডাল, আলুপোস্ত আর পাতলা মাছের ঝোল। মিতালি প্রথম গ্রাস মুখে দিয়েই থমকে গেল। পোস্তর স্বাদটা অবিকল মায়ের হাতের মতো — না, আরও পুরনো, ঠাকুমার হাতের মতো। সে কিছু বলার আগেই পিসি বললেন, “আমাদের বাড়িতে পোস্তয় একটু কাঁচা সরষের তেল ছড়িয়ে দেয়। মা শিখিয়েছিলেন।” তারপর আর কোনো কথা হল না। শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক আর বাইরে ট্রামের দূরে মিলিয়ে যাওয়া ঘণ্টা।
প্রথম রাত
রাতে মিতালির ঘুম আসছিল না। গ্রামে রাত মানে ঝিঁঝির ডাক, শেয়ালের হুক্কাহুয়া, বাঁশপাতার সরসর। এখানে রাত মানে দূরে গাড়ির হর্ন, কোনো বাড়ি থেকে টিভির আওয়াজ, আর মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে শেষ ট্রামের ঘড়ঘড় শব্দ। সে জানলা খুলে বসল। নিচে ট্রামলাইন হলুদ ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চকচক করছে। ওপরে আকাশ — কিন্তু এ আকাশে তারা প্রায় দেখাই যায় না, শহরের আলোয় সব ফিকে হয়ে গেছে।
মায়ের দেওয়া আচারের কৌটোটা খুলে একটু আঙুলে নিয়ে মুখে দিল। টক-ঝাল-মিষ্টি স্বাদটা জিভে লাগতেই চোখ ভিজে উঠল। সে ফোন করল বাড়িতে। মা ধরলেন, তারপর টুবাই কেড়ে নিল ফোন, তারপর আবার মা। বাবা তখনও ফেরেননি, ট্রেনে আছেন।
“পিসি কেমন রে?” মা জিজ্ঞেস করলেন।
মিতালি একটু ভেবে বলল, “কড়া। কিন্তু খারাপ না।”
মা হাসলেন। “রমাদি বরাবরই অমন। বাইরে শক্ত, ভেতরে নরম। অনেক কষ্ট পেয়েছে মানুষটা।”
“কী কষ্ট, মা?”
ফোনের ওপারে একটু নীরবতা। তারপর মা বললেন, “সে অনেক কথা। একদিন হয়তো রমাদি নিজেই বলবে। এখন ঘুমো।”
ফোন রেখে মিতালি নিচে নামল জল খেতে। দোতলার বারান্দা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখল, পিসির ঘরের দরজা আধখোলা। ভেতরে টেবিল-ল্যাম্পের আলোয় পিসি বসে আছেন, হাতে একটা পুরনো ছবির ফ্রেম। ছবিটা দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু পিসির মুখটা দেখা যাচ্ছিল — দিনের সেই কড়া, গোছানো মুখ নয়, একেবারে অন্যরকম। ক্লান্ত, একা, আর ভীষণ নরম।
মিতালি পা টিপে টিপে সরে এল। পরদিন সকালে চা দিতে গিয়ে সে দেখল, পিসির টেবিলে ফ্রেমটা উল্টো করে রাখা। চা নিতে নিতে পিসি হঠাৎ বললেন, “জানিস, আমার মা আমাকে কোনোদিন একটা চিঠিও লেখেননি। চল্লিশ বছরে একটাও না।” কথাটা যেন বাতাসে ছুড়ে দেওয়া, কারও উদ্দেশে নয়। তারপরই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “বাজারের ব্যাগটা নিয়ে আয়। আজ পার্শে মাছ উঠবে।”
মিতালি ব্যাগ আনতে গেল। কিন্তু সারা রাস্তা, সারা বাজার, মাছওয়ালার দরদাম আর সবজির ঝুড়ির ভিড়ের মধ্যেও কথাটা তার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল। চল্লিশ বছরে একটাও চিঠি না। অথচ নৌকায় বাবা বলেছিলেন, ঠাকুমা পিসির বিয়ের পর একবার কলকাতা এসেছিলেন। কেন এসেছিলেন? আর এসে কি পিসির সঙ্গে দেখা করেননি?
রাস্তা দিয়ে আবার একটা ট্রাম চলে গেল। টুং টুং। মিতালির মনে হল, এই শহরটা অনেক গল্প জমিয়ে রাখে, কিন্তু সহজে বলে না। ধৈর্য ধরে শুনতে হয়।