←
রামায়ণ — সহজ কথায়Ch 1/8 · 5 min
Theme
Text size
Reading mode
রামায়ণ — সহজ কথায়1. ভূমিকা ও বালকাণ্ড2. অযোধ্যাকাণ্ড🔒 অরণ্যকাণ্ড🔒 কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড🔒 সুন্দরকাণ্ড🔒 যুদ্ধকাণ্ড — সেতুবন্ধন থেকে যুদ্ধ🔒 যুদ্ধকাণ্ড — জয় ও প্রত্যাবর্তন🔒 উত্তরকাণ্ড ও রামায়ণের শিক্ষা

Log in to save highlights and notes.

Chapter 1

ভূমিকা ও বালকাণ্ড

হাজার হাজার বছর ধরে ভারতের ঘরে ঘরে একটা গল্প বলা হয়ে আসছে। ঠাকুমা নাতিকে শোনান, যাত্রার আসরে অভিনেতারা গেয়ে ওঠেন, পটুয়ারা পটে আঁকেন, আর পুজোর মণ্ডপে মূর্তি হয়ে সেই গল্পের চরিত্রেরা দাঁড়িয়ে থাকেন। গল্পটা এক রাজপুত্রের — যিনি সিংহাসন পেয়েও হাসিমুখে বনে চলে গিয়েছিলেন, যাঁর স্ত্রীকে এক পরাক্রমী রাজা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, আর যিনি বানর-ভালুকদের বন্ধুত্বে ভর করে সাগর পেরিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। এই গল্পের নাম রামায়ণ — অর্থাৎ রামের যাত্রাপথ।

রামায়ণের অনেক রূপ আছে — সংস্কৃতে, বাংলায়, তামিলে, হিন্দিতে, এমনকি থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার ভাষাতেও। কিন্তু সবচেয়ে প্রাচীন যে রূপটি আমাদের হাতে আছে, তা মহর্ষি বাল্মীকির লেখা সংস্কৃত মহাকাব্য। তাঁকে বলা হয় আদিকবি, আর তাঁর রামায়ণকে আদিকাব্য। এই বইয়ে আমরা মূলত বাল্মীকির কাহিনিই নতুন করে, নিজের ভাষায় বলব। যেখানে পরবর্তী কালের কবিরা বা লোকমুখের গল্প অন্য কথা বলে, সেখানে আমরা আলতো করে সেটাও জানিয়ে দেব।

নারদের প্রশ্ন আর এক পাখির কান্না

তমসা নদীর তীরে ছিল বাল্মীকির আশ্রম। একদিন দেবর্ষি নারদ সেখানে এলেন। বাল্মীকি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এই পৃথিবীতে এখন এমন কেউ কি আছেন, যিনি একসঙ্গে গুণবান, বীর, ধর্মজ্ঞ, কৃতজ্ঞ, সত্যবাদী আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ? যিনি সব প্রাণীর মঙ্গল চান, আর রেগে গেলে দেবতারাও যাঁকে ভয় পান? নারদ হেসে বললেন, এমন মানুষ সত্যিই আছেন — ইক্ষ্বাকু বংশের রাম। তারপর তিনি সংক্ষেপে রামের পুরো জীবনকাহিনি শুনিয়ে বিদায় নিলেন।

সেদিন দুপুরে বাল্মীকি শিষ্য ভরদ্বাজকে নিয়ে তমসায় স্নান করতে গেলেন। নদীর ধারের গাছে এক জোড়া ক্রৌঞ্চ পাখি আনন্দে ডাকাডাকি করছিল। হঠাৎ এক ব্যাধের তির এসে বিঁধল পুরুষ পাখিটির বুকে। সে রক্তমাখা শরীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, আর তার সঙ্গিনী করুণ সুরে কেঁদে ঘুরে ঘুরে উড়তে লাগল।

দৃশ্যটা দেখে ঋষির বুক ভেঙে গেল। শোকে আর রাগে তাঁর মুখ থেকে আপনা থেকেই বেরিয়ে এল কয়েকটি কথা — আর সেই কথাগুলো সাজানো ছিল এক অপূর্ব ছন্দে:

मा निषाद प्रतिष्ठां त्वमगमः शाश्वतीः समाः।
यत्क्रौञ्चमिथुनादेकमवधीः काममोहितम्॥

— সরল অর্থ: ওহে ব্যাধ, প্রেমে মগ্ন এই ক্রৌঞ্চ-জোড়ার একজনকে তুমি মেরেছ — তাই দীর্ঘকাল তুমি শান্তি ও প্রতিষ্ঠা পাবে না।

বলে ফেলেই বাল্মীকি নিজে অবাক হলেন। এ কী বললেন তিনি! চার চরণে সমান মাপের অক্ষর, গাওয়া যায় বীণার সুরে। তিনি শিষ্যকে বললেন, শোক (শোক) থেকে জন্ম নিয়েছে বলে এর নাম হোক শ্লোক। আশ্রমে ফেরার পর স্বয়ং ব্রহ্মা এসে দেখা দিলেন। তিনি বললেন, এই ছন্দ আমারই ইচ্ছায় তোমার মুখে এসেছে। নারদের কাছে যে রামকথা শুনেছ, এই ছন্দে তুমি তা-ই লেখো। যতদিন পৃথিবীতে পাহাড় আর নদী থাকবে, ততদিন মানুষ এই কাহিনি পড়বে।

এভাবেই শুরু হল রামায়ণ। গোটা কাব্যটি সাতটি কাণ্ডে ভাগ করা — বালকাণ্ড, অযোধ্যাকাণ্ড, অরণ্যকাণ্ড, কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড, সুন্দরকাণ্ড, যুদ্ধকাণ্ড আর উত্তরকাণ্ড। চলুন, প্রথম কাণ্ড দিয়েই যাত্রা শুরু করি।

তমসা নদীর তীরে বাল্মীকির আশ্রম — এখানেই জন্ম নিয়েছিল আদিকাব্য
তমসা নদীর তীরে বাল্মীকির আশ্রম — এখানেই জন্ম নিয়েছিল আদিকাব্য

অযোধ্যার চার রাজপুত্র

সরযূ নদীর তীরে কোশল রাজ্য, তার রাজধানী অযোধ্যা — চওড়া রাস্তা, উঁচু প্রাসাদ, সুখী প্রজা। সেখানকার রাজা দশরথ ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও বীর। তাঁর তিন রানি — কৌশল্যা, কৈকেয়ী আর সুমিত্রা। সব থাকলেও রাজার মনে একটাই দুঃখ ছিল — তাঁর কোনো সন্তান নেই।

কুলগুরু বশিষ্ঠ ও মন্ত্রীদের পরামর্শে দশরথ প্রথমে অশ্বমেধ যজ্ঞ করলেন, তারপর ঋষি ঋষ্যশৃঙ্গকে দিয়ে করালেন পুত্রলাভের যজ্ঞ। যজ্ঞের আগুন থেকে এক দিব্য পুরুষ সোনার পাত্রে পায়েস নিয়ে উঠে এলেন। রাজা সেই পায়েস ভাগ করে দিলেন তিন রানিকে। যথাসময়ে কৌশল্যার কোলে এলেন রাম, কৈকেয়ীর কোলে ভরত, আর সুমিত্রার কোলে যমজ দুই ভাই লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্মণ রামের ছায়া, আর শত্রুঘ্ন ভরতের সঙ্গী।

বিশ্বামিত্রের আগমন: তাড়কা ও অহল্যা

রাজপুত্ররা তখন কিশোর। একদিন রাজসভায় এলেন মহর্ষি বিশ্বামিত্র। তিনি বললেন, আমি একটি যজ্ঞ করছি, কিন্তু মারীচ আর সুবাহু নামে দুই রাক্ষস বারবার এসে রক্ত-মাংস ছিটিয়ে যজ্ঞ নষ্ট করে দেয়। আমি রামকে চাই, দশ দিনের জন্য। শুনে দশরথের মুখ শুকিয়ে গেল — ষোলো বছরও পূর্ণ হয়নি যে ছেলের, তাকে রাক্ষসের সামনে পাঠাবেন? শেষে বশিষ্ঠের বোঝানোয় তিনি রাজি হলেন। রামের সঙ্গে চললেন লক্ষ্মণও।

পথে বিশ্বামিত্র দুই ভাইকে বলা ও অতিবলা নামে দুটি বিদ্যা শেখালেন, যাতে ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ক্লান্তি তাঁদের কাবু করতে না পারে। এক ভয়ংকর বনের কাছে এসে তিনি জানালেন, এখানে থাকে তাড়কা নামে এক রাক্ষসী, যার অত্যাচারে গোটা অঞ্চল জনশূন্য। রাম প্রথমে একজন নারীকে বধ করতে দ্বিধা করছিলেন; কিন্তু তাড়কা যখন পাথর বর্ষণ করে আক্রমণ করল, আর ঋষি বোঝালেন যে প্রজাদের রক্ষা করাই রাজপুত্রের ধর্ম, তখন রাম তাকে বধ করলেন। এরপর যজ্ঞরক্ষার সময় রামের বাণে সুবাহু মারা গেল, আর মারীচ বাণের আঘাতে ছিটকে গিয়ে পড়ল বহু দূরে, সমুদ্রের ধারে। মনে রাখবেন এই মারীচকে — পরে সে আবার ফিরে আসবে।

মিথিলার পথে তাঁরা পৌঁছলেন ঋষি গৌতমের পরিত্যক্ত আশ্রমে। বিশ্বামিত্র বললেন, এখানে গৌতমের স্ত্রী অহল্যা স্বামীর অভিশাপে বহু বছর ধরে সবার চোখের আড়ালে কঠোর তপস্যা করে চলেছেন। দেবরাজ ইন্দ্র ছল করে তাঁর কাছে এসেছিলেন, সেই অপরাধের জের। রাম আশ্রমে পা রাখতেই অহল্যা দীপ্ত হয়ে আবার দৃশ্যমান হলেন। রাম ও লক্ষ্মণ শ্রদ্ধায় তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন, অহল্যা তাঁদের সমাদরে আপ্যায়ন করলেন, আর গৌতমও এসে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলেন। বাল্মীকির বর্ণনায় অহল্যা অদৃশ্য হয়ে তপস্যা করছিলেন; তিনি যে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন আর রামের পায়ের ছোঁয়ায় মানুষ হলেন — এই জনপ্রিয় ছবিটি পরবর্তী কালের নানা রামায়ণ থেকে এসেছে।

মিথিলা, সীতা আর হরধনু

মিথিলার রাজা জনক ছিলেন জ্ঞানী ও ধার্মিক। একবার যজ্ঞের জন্য জমি চষার সময় লাঙলের ফলার রেখায় (সীতা) তিনি মাটির ভেতর থেকে এক শিশুকন্যাকে পেয়েছিলেন। তার নাম রাখা হল সীতা। মাটি থেকে জন্ম বলে তাঁকে বলা হয় ভূমিকন্যাও। রাজা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তাঁর ঘরে রাখা শিবের বিশাল ধনুকে যে গুণ পরাতে পারবে, তার সঙ্গেই সীতার বিয়ে হবে। বহু রাজা চেষ্টা করেছিলেন, কেউ ধনুকটা নাড়াতেও পারেননি।

বিশ্বামিত্রের অনুরোধে লোহার সিন্দুকে রাখা সেই ধনুক আনা হল — বয়ে আনতে লেগেছিল বহু বলিষ্ঠ মানুষ। রাম অবলীলায় ধনুকটি তুলে নিলেন, গুণ পরালেন, তারপর যেই টান দিলেন — বজ্রপাতের মতো শব্দে ধনুক মাঝখান থেকে ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেল! চারপাশের মানুষ ভয়ে-বিস্ময়ে মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়।

শিবের ধনুক ভাঙার মুহূর্ত — এক নতুন যুগের সূচনা
শিবের ধনুক ভাঙার মুহূর্ত — এক নতুন যুগের সূচনা

বাল্মীকির কাব্যে এটা কোনো জমকালো স্বয়ংবর-সভা নয়; রাম ধনুক ভাঙেন জনক আর বিশ্বামিত্রের উপস্থিতিতে, প্রতিজ্ঞার শর্ত পূরণ করে। দেশ-বিদেশের রাজাদের ভিড়ে ভরা স্বয়ংবরের যে ছবি আমরা যাত্রা-সিনেমায় দেখি, তা পরবর্তী কালের সংযোজন। অযোধ্যা থেকে দশরথ সপরিবারে এলেন, আর একসঙ্গে চার ভাইয়ের বিয়ে হল — রামের সঙ্গে সীতা, লক্ষ্মণের সঙ্গে সীতার বোন ঊর্মিলা, আর ভরত ও শত্রুঘ্নের সঙ্গে জনকের ভাই কুশধ্বজের দুই কন্যা মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তি।

ফেরার পথে হঠাৎ পথ আটকালেন ক্ষত্রিয়-বিদ্বেষী ঋষি পরশুরাম। শিবের ধনুক ভাঙার খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি রামকে বিষ্ণুর ধনুকে গুণ পরানোর চ্যালেঞ্জ দিলেন। রাম শান্তভাবে সেই ধনুকও তুলে নিয়ে গুণ পরালেন। পরশুরাম বুঝলেন, এ সাধারণ মানুষ নন; তিনি সম্মান জানিয়ে তপস্যায় ফিরে গেলেন। আনন্দে-উৎসবে চার নবদম্পতি ফিরলেন অযোধ্যায়। কেউ তখনও জানত না, এই সুখের দিনগুলো কত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে আসবে।

🧠 Chapter quiz4 questions · pass 60%
Next →অযোধ্যাকাণ্ড
1 / 1