অযোধ্যাকাণ্ড
বিয়ের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। ভরত আর শত্রুঘ্ন গেছেন কেকয় দেশে, মামার বাড়িতে। অযোধ্যায় রাম তাঁর বিনয়, ধৈর্য আর প্রজাদের প্রতি মমতায় সবার নয়নের মণি। রাজা দশরথ বুড়ো হয়েছেন। একদিন তিনি সভা ডেকে মন্ত্রী, পুরোহিত আর নগরের প্রধানদের সামনে প্রস্তাব রাখলেন — আমি রামকে যুবরাজ করতে চাই। সভাজুড়ে আনন্দের রোল উঠল। ঠিক হল, পরদিন পুষ্যা নক্ষত্রের শুভক্ষণে অভিষেক হবে।
সারা রাত ধরে অযোধ্যা সাজল। রাস্তায় জল ছেটানো হল, পতাকা উড়ল, ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলল। রাম আর সীতা উপবাস ও ব্রত পালন করে পরদিনের জন্য তৈরি হলেন। কিন্তু সেই রাতেই রাজপ্রাসাদের এক কোণে শুরু হল এক ভিন্ন ষড়যন্ত্র।
মন্থরার বিষমন্ত্র
রানি কৈকেয়ীর এক পুরোনো দাসী ছিল, তার নাম মন্থরা। ছাদ থেকে নগরের সাজসজ্জা দেখে সে কারণ জানতে চাইল, আর শুনে যেন আগুন হয়ে গেল। ছুটে গিয়ে কৈকেয়ীকে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে! রাম রাজা হলে কৌশল্যা হবেন রাজমাতা, আর তুমি হবে তাঁর দাসীর মতো। ভরতের জীবনও বিপদে পড়বে।
মজার ব্যাপার, প্রথমে কৈকেয়ী খুশিই হয়েছিলেন। আনন্দে মন্থরাকে একটা গয়না উপহার দিয়ে বলেছিলেন, রাম আমার কাছে ভরতের মতোই প্রিয়। কিন্তু মন্থরা থামল না। বারবার ভয়, অপমান আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা বলে সে ধীরে ধীরে রানির মন বিষিয়ে তুলল। সন্দেহ যে কীভাবে একজন ভালো মানুষকেও বদলে দিতে পারে, অযোধ্যাকাণ্ড তার এক মর্মান্তিক উদাহরণ।
কৈকেয়ীর দুই বর
মন্থরা মনে করিয়ে দিল এক পুরোনো কথা। বহু বছর আগে দেবতা আর অসুরদের যুদ্ধে দশরথ দেবতাদের হয়ে লড়তে গিয়েছিলেন, সঙ্গে ছিলেন কৈকেয়ী। যুদ্ধে রাজা আহত হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে কৈকেয়ী রথ চালিয়ে তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে এনে প্রাণ বাঁচান। কৃতজ্ঞ রাজা তখন তাঁকে দুটি বর দিতে চেয়েছিলেন, আর কৈকেয়ী বলেছিলেন — দরকারের সময় চেয়ে নেব।
সেই রাতে কৈকেয়ী গয়না খুলে ফেলে, মলিন কাপড় পরে ক্রোধাগারে মাটিতে শুয়ে রইলেন। দশরথ এসে কারণ জানতে চাইলে তিনি আগে রাজাকে দিয়ে রামের নামে শপথ করালেন, তারপর চাইলেন সেই দুই বর:
- প্রথম বর — রামের বদলে ভরতের রাজ্যাভিষেক হবে।
- দ্বিতীয় বর — রাম চোদ্দো বছরের জন্য তপস্বীর বেশে দণ্ডকারণ্যে বনবাসে যাবেন।
শুনে বৃদ্ধ রাজা যেন বজ্রাহত হলেন। কাঁদলেন, অনুনয় করলেন, পায়ে পড়তেও চাইলেন; কিন্তু কৈকেয়ী অটল। সত্যের বাঁধনে বাঁধা রাজা কথা ফেরাতে পারলেন না। সারা রাত কাটল যন্ত্রণায়।
হাসিমুখে বনবাস
ভোরে সারথি সুমন্ত্র রামকে ডেকে আনলেন। পিতাকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে রাম চমকে উঠলেন। কৈকেয়ীই তাঁকে সব খুলে বললেন। রাম একটুও রাগ দেখালেন না, মুখের ভাবও বদলাল না। শান্ত গলায় বললেন, পিতার সত্য রক্ষার জন্য আমি আজই বনে যাব। ভরত রাজা হোক, এতে আমার কোনো দুঃখ নেই।
রাজ্য হারিয়ে বনে যাওয়ার সময়ও রামের মুখের প্রসন্নতা এতটুকু ম্লান হল না — যেমন রাতের পর ভোর এলেও চাঁদের সৌন্দর্য কমে না।
— বাল্মীকির ভাবনা অবলম্বনে
মা কৌশল্যা ভেঙে পড়লেন। লক্ষ্মণ রাগে ফুঁসে উঠে বললেন, এই অন্যায় মানব না, অস্ত্র ধরব। রাম তাঁকে শান্ত করলেন — ধর্মপথ থেকে সরে গিয়ে রাজ্য পাওয়ার চেয়ে বনে থাকা ভালো। শেষে লক্ষ্মণ বললেন, তাহলে আমিও যাব; ছায়া কি কখনো শরীর ছেড়ে থাকে? মা সুমিত্রা ছেলেকে আশীর্বাদ করে বললেন, রামকেই পিতা দশরথ ভেবো, সীতাকে আমার মতো মা ভেবো, আর বনকেই অযোধ্যা মনে কোরো।
রাম সীতাকে অযোধ্যায় থাকতে বললেন — বনে কাঁটা, হিংস্র জন্তু, রোদ-বৃষ্টি, কত কষ্ট! সীতা দৃঢ় গলায় উত্তর দিলেন, স্বামীর সঙ্গে থাকলে বনই আমার প্রাসাদ, তাঁকে ছাড়া প্রাসাদই আমার কাছে বন। তাঁর জেদের কাছে রামকে হার মানতে হল।

তিনজনে গাছের ছালের বসন (চীর) পরে রথে উঠলেন। গোটা নগর রথের পিছনে ছুটল, অনেকে সারা পথ সঙ্গে গেল। গঙ্গার তীরে শৃঙ্গবেরপুরে নিষাদরাজ গুহ বন্ধুর মতো তাঁদের আপ্যায়ন করলেন এবং নৌকায় গঙ্গা পার করে দিলেন। সেখান থেকে সুমন্ত্রকে ফেরত পাঠানো হল। তারপর প্রয়াগে ঋষি ভরদ্বাজের আশ্রম ঘুরে তাঁরা পৌঁছলেন সুন্দর পাহাড় চিত্রকূটে। সেখানে লক্ষ্মণ একটি পাতার কুটির বানালেন।
দশরথের মৃত্যু ও ভরতের ভালোবাসা
শূন্য রথ ফিরে আসার পর দশরথ আর সামলাতে পারলেন না। এক রাতে তিনি কৌশল্যাকে শোনালেন যৌবনের এক ভুলের কথা। শিকারে গিয়ে অন্ধকারে জলের শব্দ শুনে হাতি ভেবে তির ছুড়েছিলেন; তিরটি বিঁধেছিল এক তরুণ তপস্বীর বুকে, যে তার অন্ধ বাবা-মায়ের জন্য কলসিতে জল ভরছিল। শোকার্ত বাবা-মা অভিশাপ দিয়েছিলেন — তুমিও একদিন পুত্রশোকে প্রাণ হারাবে। সেই কথা বলতে বলতেই, রাম চলে যাওয়ার ষষ্ঠ রাতে, দশরথ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। (ওই তরুণের নাম বাল্মীকি বলেননি; শ্রবণকুমার নামটি পরবর্তী লোকঐতিহ্যে জনপ্রিয় হয়েছে।)
দূত পাঠিয়ে ভরতকে ডেকে আনা হল। সব শুনে ভরত মায়ের উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন, কঠোর ভাষায় তিরস্কার করলেন। শত্রুঘ্ন রাগে মন্থরাকে আঘাত করতে উদ্যত হলে ভরতই বাধা দিলেন, কারণ নারীর উপর হাত তোলা অধর্ম। পিতার শেষকৃত্য সেরে ভরত সিংহাসনে বসতে অস্বীকার করলেন। সেনা, মন্ত্রী, মায়েদের নিয়ে তিনি চললেন চিত্রকূটে, রামকে ফিরিয়ে আনতে।
চিত্রকূটে দুই ভাইয়ের মিলন এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। পিতার মৃত্যুসংবাদে রাম শোকে ভেঙে পড়লেন। ভরত বারবার অনুরোধ করলেন, ফিরে চলো, রাজ্য তোমার। কিন্তু রাম বললেন, পিতার কথা মিথ্যা হতে দিতে পারি না; চোদ্দো বছর পূর্ণ না হলে ফিরব না। শেষে ভরত রামের পাদুকা চেয়ে নিলেন। প্রতিজ্ঞা করলেন, এই পাদুকাই সিংহাসনে থাকবে, আমি শুধু তোমার প্রতিনিধি হয়ে রাজকাজ চালাব; আর চোদ্দো বছর পূর্ণ হওয়ার পরদিন তুমি না ফিরলে আমি আগুনে প্রাণ দেব।
ভরত অযোধ্যায় না থেকে কাছের গ্রাম নন্দীগ্রামে তপস্বীর মতো জটা ও চীর ধারণ করে রইলেন, আর রাজসিংহাসনে পাদুকা রেখে রাজ্য চালাতে লাগলেন। ভাইয়ের প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। ওদিকে রাম ভাবলেন, চিত্রকূটে থাকলে অযোধ্যার লোকেরা বারবার আসবে। তাই তিনি সীতা ও লক্ষ্মণকে নিয়ে ঋষি অত্রি ও তাঁর স্ত্রী অনসূয়ার আশ্রম হয়ে আরও গভীর অরণ্যের দিকে পা বাড়ালেন।