←
রূপকথার ঝুলিCh 1/8 · 3 min
Theme
Text size
Reading mode
রূপকথার ঝুলি1. চাঁদের বুড়ির ছেঁড়া সুতো2. ময়নামতী আর জাদুর মাছ🔒 ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর তিন ধাঁধা🔒 পক্ষীরাজের হারানো পালক🔒 জোনাকি-পরির লন্ঠন🔒 চম্পা আর সোনার হরিণ🔒 ঝড়-দানো আর তিন ভাইবোন🔒 একলা রাক্ষস আর বেলার সন্দেশ

Log in to save highlights and notes.

Chapter 1

চাঁদের বুড়ির ছেঁড়া সুতো

শালবনের ধারে টুনটুনির ঘর

অনেক অনেক দিন আগে, এক শালবনের ধারে ছিল ছোট্ট একটা গ্রাম। সেই গ্রামের শেষ মাথায়, একটা খড়ের চালের ঘরে থাকত টুনটুনি আর তার ঠাকুমা। টুনটুনির বয়স দশ, মাথায় এলোমেলো কোঁকড়া চুল, আর চোখ দুটো সবসময় কৌতূহলে চকচক করে। ঠাকুমা সারাদিন বসে বসে উল বোনেন, আর টুনটুনি পাশে বসে সুতোর গোলা ধরে রাখে।

রাতে শোবার আগে ঠাকুমা জানলা দিয়ে আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলতেন, — ওই দেখ টুনি, চাঁদের মধ্যে চাঁদের বুড়ি বসে চরকা কাটছে। ওই চরকার সুতো দিয়েই তো জ্যোৎস্না তৈরি হয়। সেই রুপোলি সুতো নেমে আসে পৃথিবীতে, আর আমরা রাতে পথ দেখতে পাই।

টুনটুনি অবাক হয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকত। সত্যিই যেন একটা ছায়া — কেউ বসে আছে, ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা ঘোরাচ্ছে।

শালবনের মাথায় পূর্ণিমার চাঁদ — চাঁদের বুড়ি চরকা কাটছেন
শালবনের মাথায় পূর্ণিমার চাঁদ — চাঁদের বুড়ি চরকা কাটছেন

জ্যোৎস্না হারিয়ে গেল

একবার হল কী, পূর্ণিমার রাত, অথচ আকাশে চাঁদ আছে কিন্তু আলো নেই! চাঁদটা যেন একটা ফ্যাকাশে থালা, তা থেকে একফোঁটা জ্যোৎস্নাও নামছে না। পরের রাতেও তাই, তার পরের রাতেও। গ্রামের লোকেরা অন্ধকারে পথ হারায়, শেয়ালের ডাকে বাচ্চারা ভয় পায়, জোনাকিরাও যেন মনমরা হয়ে লুকিয়ে থাকে।

সেই রাতে টুনটুনির ঘুম আসছিল না। হঠাৎ জানলার শিকে এসে বসল একটা বুড়ো লক্ষ্মীপেঁচা। পেঁচাটা গম্ভীর গলায় বলল, — তুমিই তো সুতো-ধরা মেয়ে টুনটুনি? চাঁদের বুড়ি তোমায় ডেকেছেন। তাঁর চরকার সুতো ছিঁড়ে গেছে, আর জট এত শক্ত যে তাঁর বুড়ো আঙুলে খোলে না। যে হাত রোজ ধৈর্য ধরে সুতো ধরে, সেই হাতই পারবে।

টুনটুনি একটু ভয় পেল। কিন্তু তারপর ভাবল — গ্রামের সবাই অন্ধকারে কষ্ট পাচ্ছে। সে ঠাকুমার বোনার কাঁটা দুটো আর নিজের লাল ফিতেটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

পেঁচা তাকে নিয়ে গেল শালবনের সবচেয়ে উঁচু গাছটার নিচে। সেখান থেকে একটা সরু, ঝাপসা আলোর মই উঠে গেছে আকাশে — জ্যোৎস্নার শেষ সুতোটুকু দিয়ে তৈরি। পেঁচা বলল, — সাবধানে ওঠো, নিচের দিকে তাকিও না। আর মনে রেখো, যা কথা দেবে তা রাখবে।

চাঁদের দেশে

টুনটুনি উঠছে তো উঠছেই। মেঘ পেরোল, তারাদের পাশ কাটাল — তারারা ফিসফিস করে বলল, "এগিয়ে যাও!" শেষে পৌঁছল চাঁদে। চারদিক সাদা ধুলোয় ঢাকা, আর মাঝখানে একটা মস্ত চরকার পাশে বসে আছেন এক বুড়ি। তাঁর চুল দুধের মতো সাদা, মুখে হাজার ভাঁজ, কিন্তু চোখ দুটো ভারি মিষ্টি।

— এসেছিস মা? — বুড়ি হাসলেন। — দেখ তো, কী কাণ্ড! এক দুষ্টু ধূমকেতু ছুটে যেতে যেতে লেজের ঝাপটায় আমার সুতো জড়িয়ে ছিঁড়ে দিয়ে গেছে।

টুনটুনি দেখল, রুপোলি সুতোর একটা বিশাল জট — যেন হাজারটা গিঁট একসঙ্গে পাকিয়ে আছে। সে কাঁটা দুটো দিয়ে খুব সাবধানে একটা একটা গিঁট খুলতে লাগল, ঠিক যেমন ঠাকুমা শিখিয়েছেন — টানাটানি নয়, আলতো করে, ধৈর্য ধরে। এক প্রহর গেল, দুই প্রহর গেল। হাত ব্যথা করছে, চোখ ঢুলে আসছে, তবু সে থামল না।

শেষে সব জট খুলে গেল। কিন্তু সুতোর দুটো ছেঁড়া মাথা এত ছোট যে জোড়া লাগে না। টুনটুনি এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর নিজের চুল থেকে লাল ফিতেটা খুলে দুই মাথার মাঝে শক্ত করে বেঁধে দিল। এই ফিতেটা ছিল তার মায়ের দেওয়া, তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস।

চাঁদের বুড়ি চরকা ঘোরালেন — ঘর্‌র্‌র্‌... আর অমনি রুপোলি সুতো ঝরঝর করে নেমে গেল পৃথিবীর দিকে। নিচে শালবন, নদী, গ্রাম — সব জ্যোৎস্নায় ভেসে গেল!

উপহার

বুড়ি টুনটুনির মাথায় হাত রেখে বললেন, — তুই নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা দিয়ে দিলি, একবারও ভাবলি না। তাই এখন থেকে প্রতি পূর্ণিমায় জ্যোৎস্নার মধ্যে একটা সরু লাল আভা থাকবে — শুধু যারা মন দিয়ে দেখে, তারাই দেখতে পাবে। আর এই নে।

তিনি টুনটুনির হাতে দিলেন এক গোলা রুপোলি সুতো। — এই সুতোয় যা বুনবি, তা কখনো ছিঁড়বে না, আর অন্ধকারে আলো দেবে।

আলোর মই বেয়ে নেমে টুনটুনি যখন ঘরে ফিরল, তখন ভোর হচ্ছে। ঠাকুমা জানলার ধারে বসে, চোখে জল। টুনটুনি সব খুলে বলল। ঠাকুমা কিছু বললেন না, শুধু তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

সেই রুপোলি সুতো দিয়ে ঠাকুমা আর টুনটুনি মিলে গ্রামের প্রতিটি বাচ্চার জন্য একটা করে ছোট্ট মাফলার বুনে দিল। অমাবস্যার রাতেও সেই মাফলারগুলো মিটমিট করে জ্বলত, আর কোনো শিশু আর অন্ধকারে ভয় পেত না। আজও পূর্ণিমার রাতে মন দিয়ে চাঁদের দিকে তাকালে, কেউ কেউ জ্যোৎস্নার ভেতরে একটা সরু লাল রেখা দেখতে পায়।

ধৈর্য আর ভাগ করে দেওয়ার মন — এই দুটো থাকলে ছোট হাতও আকাশের জট খুলতে পারে।

— এই গল্পের শিক্ষা

🧠 Chapter quiz4 questions · pass 60%
Next →ময়নামতী আর জাদুর মাছ
1 / 1