ময়নামতী আর জাদুর মাছ
চন্দনা নদীর জেলেপাড়া
চন্দনা নদীর ধারে ছিল একটা জেলেপাড়া। সেখানে থাকত ময়নামতী — সবাই তাকে ডাকত ময়না। তার বাবা নদীতে মাছ ধরেন, আর বারো বছরের ময়না ভোরবেলা বাবার সঙ্গে ডিঙিতে চড়ে জাল টানতে সাহায্য করে। ময়না সাঁতারে পাকা, জাল বুনতে ওস্তাদ, আর নদীর প্রতিটা বাঁক তার চেনা।
সেই এলাকার জমিদার ছিল ধনপতি রায়। তার সিন্দুক ভরা সোনা, তবু তার লোভের শেষ নেই। নদীর মাছের উপরেও সে খাজনা বসিয়েছিল — জেলেরা যত মাছ ধরবে, তার অর্ধেক দিতে হবে জমিদারবাড়িতে।
সেবার গ্রীষ্ম এল ভয়ানক। মাসের পর মাস বৃষ্টি নেই। চন্দনা নদী শুকিয়ে সরু হয়ে গেল, মাছ প্রায় নেই বললেই চলে। জেলেপাড়ার উনুনে আর রোজ আগুন জ্বলে না।

জালে উঠল আশ্চর্য মাছ
এক ভোরে ময়না একা গিয়েছিল নদীর সবচেয়ে গভীর দহে। জাল ফেলে টানতেই ভারী লাগল। টেনে তুলে দেখে — একটা মাছ, যার আঁশ সোনালি আর নীল, যেন সূর্যোদয়ের আলো জলে গলে গেছে। মাছটার চোখ দুটো মানুষের মতো, আর সেখানে টলটল করছে জল।
মাছটা পরিষ্কার মানুষের গলায় বলল, — মেয়ে, আমি এই নদীর প্রাণ। আমি যতদিন জলে থাকি, ততদিন চন্দনা বেঁচে থাকে। কিন্তু জল কমে যাওয়ায় আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি, তাই তোমার জালে ধরা পড়লাম। আমায় ছেড়ে দাও। বদলে আমি তোমার একটা ইচ্ছে পূরণ করব।
ময়না এক মুহূর্তও দেরি করল না। আলতো করে মাছটাকে আবার জলে নামিয়ে দিল। — ইচ্ছের কথা পরে ভাবব। তুমি আগে ভালো হয়ে ওঠো।
মাছটা অবাক হল। — কেউ এর আগে ইচ্ছে না চেয়ে আমাকে ছাড়েনি। বেশ, যখন ইচ্ছে ঠিক করবে, এই দহের জলে তিনবার হাত ছুঁইয়ে আমার নাম ডেকো — 'জলকন্যা'।
জমিদারের ফাঁদ
কিন্তু নদীর ধারে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনে ফেলেছিল জমিদারের চর ভোলা। সে ছুটে গিয়ে ধনপতিকে খবর দিল। জমিদারের চোখ লোভে জ্বলে উঠল। — ইচ্ছে পূরণের মাছ! ওটা আমার চাই। ওকে ধরে কাচের হাঁড়িতে রাখব, আর রোজ একটা করে ইচ্ছে আদায় করব!
পরদিন সকালে জমিদারের লোকেরা মস্ত মস্ত জাল নিয়ে এসে গোটা দহ ঘিরে ফেলল। ধনপতি নিজে ঘাটে দাঁড়িয়ে হুকুম দিচ্ছে। জেলেরা ভয়ে কাঁপছে — নদীর প্রাণ ধরা পড়লে চন্দনা যে চিরকালের মতো শুকিয়ে যাবে!
ময়না ভাবল, ভাবল, তারপর একটা বুদ্ধি বের করল। সে সোজা জমিদারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। — হুজুর, আপনার জালে তো অনেক ফুটো। মাছটা ভারি পিছল, এই জালে ধরা পড়বে না। আমি জাল বুনতে জানি। আমায় একটু সময় দিন, আমি এমন জাল বুনে দেব যে মাছ কেন, একটা চুনোপুঁটিও পালাতে পারবে না।
ধনপতি খুশি হয়ে রাজি হল। ময়না জাল বুনতে বসল দহের ধারে। আর বুনতে বুনতে চুপিচুপি জলে তিনবার হাত ছুঁইয়ে ফিসফিস করে ডাকল, — জলকন্যা!
ময়নার ইচ্ছে
জলের ভেতর থেকে মৃদু আওয়াজ এল, — বলো মেয়ে, কী চাও? সোনা? প্রাসাদ? জমিদারের চেয়েও বেশি ধন?
ময়না চোখ বন্ধ করল। তার মনে পড়ল খালি উনুন, খিদেয় কাঁদা ছোট ভাইবোনেরা, শুকনো ফাটা মাঠ। সে বলল, — আমি চাই, চন্দনা নদী যেন আর কখনো শুকিয়ে না যায়। আর এই নদীর জল ও মাছ যেন সবার হয় — কোনো একজন যেন একা একে আটকে রাখতে না পারে।
মুহূর্তের মধ্যে আকাশ কালো হয়ে এল। ঝমঝমিয়ে নামল বৃষ্টি — প্রথম বর্ষার মিষ্টি বৃষ্টি। নদী ফুলে উঠল, স্রোত বইতে লাগল। আর আশ্চর্য! জমিদারের লোকদের হাতের জালগুলো জলে ছুঁতেই গলে গিয়ে জলের ফেনা হয়ে গেল। ধনপতি যতবার নৌকায় উঠতে যায়, নৌকা ততবার পিছলে সরে যায়। শেষে সে কাদা মেখে ভূত হয়ে বাড়ি পালাল।
পরদিন থেকে জমিদারবাড়ির কোনো জাল আর চন্দনায় টিকত না, তাই মাছের খাজনাও উঠে গেল। কিন্তু জেলেরা যখন নিজেদের পেট ভরার মতো মাছ ধরত, নদী তাদের দুহাত ভরে দিত। ময়না আর তার বন্ধুরা মিলে ঠিক করল — ডিম পাড়ার মাসে কেউ মাছ ধরবে না, যাতে নদী আবার ভরে ওঠে।
আর মাঝে মাঝে, ভোরের আলো যখন জলে পড়ে, ময়না দহের ধারে বসে থাকে। তখন জলের নিচে একটা সোনালি-নীল ঝিলিক দেখা যায় — যেন কেউ তাকে হাত নেড়ে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।
যে ইচ্ছে শুধু নিজের জন্য নয়, সবার জন্য — সেই ইচ্ছেই সবচেয়ে বড় জাদু।
— এই গল্পের শিক্ষা