ভারতীয় সংস্কৃতির পরিচয়
ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে বৈচিত্র্য। উত্তরে বরফে ঢাকা হিমালয়, পশ্চিমে থর মরুভূমি, পূর্বে সবুজ পাহাড় আর বদ্বীপ, দক্ষিণে তিন দিকে সমুদ্র। এই ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মবিশ্বাস, উৎসব আর শিল্পরীতি। তবু এই সব কিছুর ভিতরে একটা অদৃশ্য সুতো আছে, যা আমাদের এক জাতি হিসেবে বেঁধে রেখেছে। এই সুতোর নামই ভারতীয় সংস্কৃতি।
‘সংস্কৃতি’ শব্দটি এসেছে ‘সংস্কার’ থেকে, যার অর্থ পরিশীলন বা পরিমার্জন। কোনো জনগোষ্ঠী কীভাবে ভাবে, কী বিশ্বাস করে, কীভাবে আনন্দ প্রকাশ করে, কীভাবে ঘর বানায়, কী রাঁধে, কী গান গায় — এই সমস্ত অভ্যাসের সমষ্টিই তার সংস্কৃতি। শিল্প সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ। নাচ, গান, ছবি, মূর্তি, মন্দির, কাপড় বোনা — প্রতিটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনের গল্প।

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য
ভারতীয় সংস্কৃতির মূল কথা হল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে নানা জনগোষ্ঠী এসেছে, থেকেছে, মিশে গেছে। সিন্ধু সভ্যতার নগরবাসী, বৈদিক যুগের মানুষ, বৌদ্ধ ও জৈন ভাবধারা, পরবর্তীকালে তুর্কি, আফগান, মুঘল এবং ইউরোপীয়দের আগমন — প্রত্যেকে কিছু না কিছু রেখে গেছে। তাই আমাদের সংগীতে যেমন সামবেদের সুরের ঐতিহ্য আছে, তেমনি আছে সুফি কাওয়ালির প্রভাব। আমাদের স্থাপত্যে যেমন শিখরযুক্ত মন্দির আছে, তেমনি আছে গম্বুজ আর খিলানওয়ালা মসজিদ ও সমাধিসৌধ।
এই মেলবন্ধনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল গ্রহণ করার ক্ষমতা। ভারতীয় সংস্কৃতি নতুনকে ভয় পায়নি, বরং নিজের মতো করে আপন করে নিয়েছে। বাংলার বাউল গানে যেমন বৈষ্ণব ভাবনা আর সুফি দর্শন মিশেছে, তেমনি উত্তর ভারতের কত্থক নাচ মন্দিরের কথকতা থেকে জন্ম নিয়ে পরে মুঘল দরবারে নতুন রূপ পেয়েছে।
নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান — বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান।
— ভারতের ঐক্যের চিরকালীন ভাবনা
সংস্কৃতির নানা দিক
সুবিধার জন্য ভারতীয় সংস্কৃতিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে পড়া যায়। এই বইয়ের পরের অধ্যায়গুলি এই ভাগ অনুসারেই সাজানো।
- পরিবেশন শিল্প (Performing Arts): শাস্ত্রীয় ও লোকনৃত্য, সংগীত, নাটক, পুতুলনাচ।
- দৃশ্য শিল্প (Visual Arts): গুহাচিত্র, অনুচিত্র বা মিনিয়েচার, লোকচিত্র, আধুনিক চিত্রকলা, ভাস্কর্য।
- স্থাপত্য: নগর পরিকল্পনা, স্তূপ, মন্দির, মসজিদ, দুর্গ, প্রাসাদ, ঔপনিবেশিক ভবন।
- উৎসব ও লোকাচার: ধর্মীয় উৎসব, ফসল উৎসব, মেলা, লোকনাট্য।
- হস্তশিল্প ও বস্ত্রশিল্প: তাঁত, সূচিকর্ম, ধাতুশিল্প, পোড়ামাটির কাজ।
- ভাষা ও সাহিত্য: বেদ-উপনিষদ থেকে আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত বিশাল ভাণ্ডার।
মনে রাখা দরকার, এই ভাগগুলি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একটি মন্দিরে স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সংগীত আর নৃত্য — সব একসঙ্গে বাস করে। দুর্গাপুজোর একটি প্যান্ডেলে প্রতিমাশিল্প, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য, আলপনা আর খাদ্যসংস্কৃতি মিলে যায় এক বিশাল উৎসবে।
ইউনেস্কো ও আমাদের অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
রাষ্ট্রসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO) দুই ধরনের ঐতিহ্যের তালিকা রাখে। একটি হল বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্র (World Heritage Sites) — যেমন তাজমহল, কোনারকের সূর্যমন্দির, অজন্তা গুহা, সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান। অন্যটি হল মানবজাতির অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (Intangible Cultural Heritage of Humanity)। ‘অধরা’ মানে যা হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় না — যেমন গান, নাচ, উৎসব, আচার, জ্ঞান ও দক্ষতা। এগুলি বেঁচে থাকে মানুষের চর্চার মধ্যে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরের মাধ্যমে।
ভারতের বেশ কয়েকটি ঐতিহ্য এই অধরা তালিকায় স্থান পেয়েছে। পরীক্ষার দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উদাহরণ নিচে দেওয়া হল।
- কলকাতার দুর্গাপুজো — ২০২১ সালে তালিকাভুক্ত। শিল্প, সমাজ ও ধর্মের মিলনক্ষেত্র হিসেবেই এর বিশেষত্ব।
- কুম্ভমেলা — ২০১৭ সালে তালিকাভুক্ত। প্রয়াগরাজ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী ও নাসিক — এই চার স্থানে পালাক্রমে অনুষ্ঠিত হয়; পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শান্তিপূর্ণ জনসমাগম।
- যোগ — ২০১৬ সালে তালিকাভুক্ত। শরীর ও মনের সমন্বয়ের এই প্রাচীন ভারতীয় পদ্ধতি আজ সারা বিশ্বে চর্চিত।
- বাউল গান — ২০০৫ সালে ‘মাস্টারপিস’ হিসেবে ঘোষিত, ২০০৮ সালে তালিকাভুক্ত।
- ছৌ নৃত্য — ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত।
- বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের ঐতিহ্য, রামলীলা এবং কেরলের সংস্কৃত নাট্য কুটিয়াট্টম — এগুলিও তালিকায় রয়েছে।
উল্লেখ্য, বাউল গানের প্রসঙ্গে ২০০৫ সালের ঘোষণা বাংলাদেশের মনোনয়নের ভিত্তিতে হয়েছিল; বাউল ঐতিহ্য দুই বাংলারই যৌথ সম্পদ। এই ধরনের খুঁটিনাটি পরীক্ষায় প্রশ্ন হিসেবে আসতে পারে, তাই মনে রাখা ভালো।
কেন সংস্কৃতি পড়ব?
অনেকে ভাবেন শিল্প-সংস্কৃতি শুধু শখের বিষয়। কিন্তু আসলে নিজের সংস্কৃতিকে জানা মানে নিজের শিকড়কে চেনা। একজন ছাত্র যখন জানে যে তার এলাকার পোড়ামাটির ঘোড়া বা তার দিদিমার সেলাই করা কাঁথা একটি দীর্ঘ শিল্প-ঐতিহ্যের অংশ, তখন সে সেই ঐতিহ্যকে সম্মান করতে শেখে। আবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় — বিশেষত UPSC-র সাধারণ অধ্যয়ন প্রথম পত্র (GS-1) এবং WBCS-এর মতো রাজ্যস্তরের পরীক্ষায় — ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতি একটি নিয়মিত বিষয়।
এই বইয়ে আমরা প্রতিটি অধ্যায়ে মূল তথ্যগুলিকে সহজ ভাষায়, উদাহরণসহ বোঝার চেষ্টা করব। তথ্য মুখস্থ করার চেয়ে বিষয়টি বুঝে নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর — কারণ যা বোঝা যায়, তা সহজে ভোলা যায় না। চলুন, শুরু করা যাক ভারতের নৃত্যের জগৎ দিয়ে।