শাস্ত্রীয় নৃত্য
ভারতীয় নৃত্য শুধু শরীরের ছন্দ নয়, এটি একসঙ্গে কবিতা, সংগীত, অভিনয় আর ভক্তির প্রকাশ। হাতের একটি মুদ্রা, চোখের একটি চাহনি দিয়ে নৃত্যশিল্পী একটি সম্পূর্ণ গল্প বলে দিতে পারেন। এই অধ্যায়ে আমরা জানব শাস্ত্রীয় নৃত্যের মূল তত্ত্ব এবং সংগীত নাটক অকাদেমি স্বীকৃত আটটি শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীর কথা।

নাট্যশাস্ত্র: ভারতীয় নৃত্যের ভিত্তি
ভারতীয় পরিবেশন শিল্পের সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল নাট্যশাস্ত্র, যার রচয়িতা হিসেবে ভরত মুনির নাম প্রচলিত। সংস্কৃত ভাষায় লেখা এই গ্রন্থে নাটক, নৃত্য, সংগীত, মঞ্চসজ্জা, পোশাক — সব কিছু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। ঐতিহ্যগতভাবে একে ‘পঞ্চম বেদ’ও বলা হয়।
নাট্যশাস্ত্রের কয়েকটি মৌলিক ধারণা প্রতিটি শাস্ত্রীয় নৃত্যেই দেখা যায়:
- নৃত্ত: বিশুদ্ধ নৃত্য — ছন্দ ও তালের সঙ্গে শরীরের গতি, যার কোনো কাহিনিগত অর্থ নেই।
- নৃত্য: ভাবপ্রকাশক নাচ — মুদ্রা ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ প্রকাশ।
- নাট্য: নাটকীয় উপস্থাপনা — সংলাপ ও চরিত্রসহ সম্পূর্ণ কাহিনি।
- চার প্রকার অভিনয়: আঙ্গিক (শরীর), বাচিক (বাক্য ও গান), আহার্য (পোশাক ও সাজ) এবং সাত্ত্বিক (অন্তরের ভাব)।
- রস ও ভাব: দর্শকের মনে যে আস্বাদন জাগে তাকে রস বলে। নাট্যশাস্ত্রে মূলত আটটি রসের কথা আছে; পরবর্তীকালে শান্ত রস যুক্ত হয়ে ‘নবরস’ ধারণা জনপ্রিয় হয়।
নৃত্যকে আবার দুই ভাবে দেখা হয় — তাণ্ডব (পৌরুষদীপ্ত, শক্তিশালী) এবং লাস্য (কোমল, লালিত্যপূর্ণ)। কোনো নৃত্যশৈলীতে তাণ্ডবের ভাগ বেশি, কোনোটিতে লাস্যের।
আটটি শাস্ত্রীয় নৃত্য
সংগীত নাটক অকাদেমি আটটি নৃত্যশৈলীকে শাস্ত্রীয় মর্যাদা দিয়েছে। প্রতিটির নাম, রাজ্য ও প্রধান বৈশিষ্ট্য মনে রাখলে পরীক্ষায় অনেক প্রশ্নের উত্তর সহজ হয়ে যায়।
- ভরতনাট্যম — তামিলনাড়ু: মন্দিরকেন্দ্রিক ঐতিহ্যে লালিত; আগে ‘সাদির’ নামে পরিচিত ছিল। অর্ধেক বসা ভঙ্গি ‘অরামণ্ডি’, জ্যামিতিক নিখুঁত অঙ্গভঙ্গি এবং সূক্ষ্ম মুদ্রা এর বৈশিষ্ট্য। বিংশ শতকে রুক্মিণী দেবী অরুণ্ডেল এই নৃত্যের পুনরুজ্জীবন ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা নেন।
- কত্থক — উত্তর ভারত (মূলত উত্তরপ্রদেশ): ‘কথক’ বা কথাকারদের গল্প বলার ধারা থেকে নাম। দ্রুত চক্কর (ঘূর্ণন), ঘুঙুরের জটিল পদচারণা (তৎকার) এর বৈশিষ্ট্য। মুঘল দরবারে এটি নতুন রূপ পায়। প্রধান ঘরানা — লখনউ, জয়পুর ও বেনারস।
- কথাকলি — কেরল: নৃত্যনাট্য; রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি পরিবেশিত হয়। মুখে বিস্তৃত রঙিন সাজ, বিশাল মুকুট ও পোশাক; সবুজ রং (পচ্চা) সাধারণত সৎ ও মহৎ চরিত্রের প্রতীক। ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষেরাই নারী চরিত্রেও অভিনয় করতেন।
- কুচিপুড়ি — অন্ধ্রপ্রদেশ: কৃষ্ণা জেলার কুচিপুড়ি গ্রামের নামে নাম। নৃত্য ও সংলাপের মিশ্রণ; ‘তরঙ্গম’ অংশে শিল্পী পিতলের থালার কিনারায় দাঁড়িয়ে নাচেন। সিদ্ধেন্দ্র যোগীর ‘ভামাকলাপম’ এই ধারার সঙ্গে যুক্ত।
- ওড়িশি — ওড়িশা: মন্দিরের ‘মাহারী’ ও বালকদের ‘গোটিপুয়া’ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। দুটি মূল ভঙ্গি — ‘চৌক’ (বর্গাকার, দৃঢ়) ও ‘ত্রিভঙ্গ’ (শরীর তিন জায়গায় বাঁকানো)। জয়দেবের গীতগোবিন্দ এর প্রিয় বিষয়। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র এর প্রখ্যাত আচার্য।
- সত্রীয়া — অসম: পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে বৈষ্ণব সাধক শ্রীমন্ত শংকরদেব এর প্রবর্তন করেন। অসমের বৈষ্ণব মঠ বা ‘সত্র’-এ লালিত বলে এই নাম। সংগীত নাটক অকাদেমি ২০০০ সালে একে শাস্ত্রীয় স্বীকৃতি দেয়।
- মণিপুরী — মণিপুর: কোমল, প্রবাহমান গতি; পায়ে ঘুঙুর পরা হয় না। রাধা-কৃষ্ণের ‘রাসলীলা’ এর প্রধান বিষয়। নর্তকীর নলাকার শক্ত ঘাগরা (পোটলোই) চোখে পড়ার মতো। ঢোল বাজিয়ে নাচ ‘পুং চোলম’ এর সঙ্গে যুক্ত।
- মোহিনীয়াট্টম — কেরল: ‘মোহিনী’ অর্থাৎ মনোমোহিনী নারীর নাচ; লাস্য-প্রধান, দোলায়মান কোমল গতি। সাদা ও সোনালি পাড়ের কেরলীয় পোশাক এর পরিচয়।
যতো হস্তস্ততো দৃষ্টির্যতো দৃষ্টিস্ততো মনঃ।
যতো মনস্ততো ভাবো যতো ভাবস্ততো রসঃ॥— অর্থ: যেখানে হাত, সেখানে দৃষ্টি; যেখানে দৃষ্টি, সেখানে মন; যেখানে মন, সেখানে ভাব; আর যেখানে ভাব, সেখানেই রস — নৃত্যচর্চার বহুল প্রচলিত শ্লোক
মনে রাখার কৌশল ও কিছু জরুরি তথ্য
আটটি নৃত্যের মধ্যে দুটি কেরলের — কথাকলি ও মোহিনীয়াট্টম। একটিতে তাণ্ডবের প্রাধান্য, অন্যটিতে লাস্যের। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে দুটি — মণিপুরী ও সত্রীয়া, এবং দুটিই বৈষ্ণব ভক্তি-ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পূর্ব ভারতের ওড়িশি এবং দক্ষিণের ভরতনাট্যম দুটিই মন্দির-ভাস্কর্যের ভঙ্গির সঙ্গে আশ্চর্য মিল দেখায়।
পরীক্ষায় প্রায়ই জিজ্ঞাসা করা হয় — কোন নৃত্য সবচেয়ে শেষে শাস্ত্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে? উত্তর: সত্রীয়া (২০০০)। আবার ‘পিতলের থালার উপর নাচ’ বললেই কুচিপুড়ি, ‘ত্রিভঙ্গ’ বললেই ওড়িশি, ‘চক্কর ও ঘুঙুরের তৎকার’ বললেই কত্থক মনে পড়া উচিত।
একটি কথা মনে রাখা জরুরি: সংগীত নাটক অকাদেমির তালিকায় আটটি নৃত্য থাকলেও, ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক ছৌ নৃত্যকেও শাস্ত্রীয় নৃত্য হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। তাই প্রশ্নে কোন সংস্থার কথা বলা হয়েছে, তা খেয়াল করে উত্তর দিতে হবে।
শাস্ত্রীয় নৃত্য শিখতে বহু বছরের সাধনা লাগে — গুরু-শিষ্য পরম্পরায় এই বিদ্যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলেছে। আজ বহু শিল্পী এই প্রাচীন নৃত্যশৈলীতে নতুন বিষয় যোগ করে সমকালীন প্রশ্নও তুলে ধরছেন, অথচ মূল ব্যাকরণ অটুট রাখছেন। এখানেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রাণশক্তি।