অধ্যায় ১ · উদ্যোক্তার মন
শ্যামবাজারের মোড় থেকে একটু ভেতরে ঢুকলে একটা পুরোনো মিষ্টির দোকান — ‘মধুমিতা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। দোকানটা চালান রুমা দত্ত। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি যখন প্রথম ক্যাশবাক্সের সামনে বসেছিলেন, পাড়ার অনেকেই বলেছিল, ‘দোকানটা বেচে দাও, এসব মেয়েদের কাজ নয়।’ রুমা কিছু বলেননি। পরের দিন ভোর পাঁচটায় উঠে কারিগরদের সঙ্গে বসে রসগোল্লার পাক দেখেছিলেন, খাতায় লিখে রেখেছিলেন কোন দিন কত ছানা লাগে, কত বিক্রি হয়, কত ফেলে দিতে হয়। ছয় মাস পরে দোকানের ফেলে-দেওয়া মিষ্টি অর্ধেকে নেমে এসেছিল। এই গল্পটা (কাল্পনিক, কিন্তু আমাদের চারপাশে এমন মানুষ অনেক) দিয়েই বইটা শুরু করছি, কারণ ব্যবসার প্রথম পুঁজি টাকা নয় — মন।
এই বইয়ের নাম ‘শূন্য থেকে শতকোটি’। শতকোটি মানে একশো কোটি টাকা। শুনে মনে হতে পারে, এ তো স্বপ্নের কথা। হ্যাঁ, স্বপ্নই। কিন্তু প্রতিটি বড় ব্যবসা একদিন একটা ছোট দোকান, একটা ঘর, একটা ল্যাপটপ বা একটা ঠেলাগাড়ি থেকেই শুরু হয়েছিল। এই বই কোনো জাদুমন্ত্র দেবে না, লাভের গ্যারান্টিও দেবে না। ব্যবসায় ঝুঁকি আছে, লোকসানও হয়। এই বই দেবে একটা পরিষ্কার পথনকশা — কোথা থেকে শুরু করবেন, কী মাপবেন, কোন ভুলগুলো এড়াবেন, আর কীভাবে ধাপে ধাপে বড় হবেন।

উদ্যোক্তা কাকে বলে?
‘উদ্যোক্তা’ শব্দটা ইংরেজির Entrepreneur-এর বাংলা। সহজ কথায়, উদ্যোক্তা সেই মানুষ যিনি কোনো একটা সমস্যা বা চাহিদা দেখেন, তার সমাধান হিসেবে একটা পণ্য বা সেবা তৈরি করেন, আর সেই কাজের ঝুঁকি নিজের কাঁধে নেন। চাকরিতে মাসের শেষে মাইনে নিশ্চিত; উদ্যোগে কিছুই নিশ্চিত নয়। আবার চাকরিতে আয়ের একটা সীমা থাকে; উদ্যোগে সেই সীমা আপনি নিজে ঠিক করেন। এই অনিশ্চয়তা আর সম্ভাবনা — দুটোই একসঙ্গে মেনে নেওয়ার ক্ষমতাই উদ্যোক্তার মনের প্রথম লক্ষণ।
অনেকে ভাবেন, উদ্যোক্তা হতে গেলে বড় ডিগ্রি, বড় পরিবার বা বড় পুঁজি লাগে। বাস্তবে আমাদের পাড়ার মুদির দোকানদার, অনলাইনে শাড়ি বিক্রি করা গৃহবধূ, মোবাইল সারাইয়ের ছোট দোকানের ছেলেটি — সবাই উদ্যোক্তা। তফাত শুধু একটা জায়গায়: কে কতটা শেখে, কতটা হিসাব রাখে, আর কতটা ধৈর্য ধরে।
উদ্যোক্তার মনের সাতটি অভ্যাস
- মালিকানা নেওয়া: দোষ বাজার, সরকার বা কর্মচারীর ঘাড়ে না চাপিয়ে ভাবা — ‘এই অবস্থায় আমি কী করতে পারি?’
- গ্রাহককে কেন্দ্রে রাখা: ‘আমি কী বেচতে চাই’ নয়, ‘গ্রাহক কী চায় এবং কেন চায়’ — এই প্রশ্ন বারবার করা।
- হিসাবের অভ্যাস: প্রতিদিনের আয়-ব্যয় লিখে রাখা। যা মাপা যায় না, তা উন্নত করা যায় না।
- ছোট পরীক্ষা, দ্রুত শিক্ষা: বড় টাকা ঢালার আগে ছোট করে চেষ্টা করে দেখা।
- ব্যর্থতাকে তথ্য হিসেবে দেখা: একটা চেষ্টা না চললে সেটা লজ্জা নয়, শিক্ষা।
- শেখার খিদে: বই, অভিজ্ঞ মানুষ, প্রতিযোগী, এমনকি অসন্তুষ্ট গ্রাহক — সবার কাছ থেকে শেখা।
- সততা: কম ওজন, ভেজাল বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে দু-দিনের লাভ হয়, কিন্তু নাম চিরকালের মতো নষ্ট হয়।
এই সাতটি অভ্যাসের কোনোটাই জন্মগত নয়। প্রতিটিই শেখা যায়, অনুশীলন করা যায়। রুমা দত্ত হিসাবের খাতা দিয়ে শুরু করেছিলেন; সেখান থেকেই তাঁর ‘মালিকানা’ এসেছিল, কারণ সংখ্যা চোখের সামনে থাকলে অজুহাত দেওয়া কঠিন।
ভয়, লজ্জা আর ‘লোকে কী বলবে’
বাঙালি পরিবারে ব্যবসা নিয়ে একটা পুরোনো দ্বিধা আছে। ‘ভালো ছেলে চাকরি করে’, ‘ব্যবসা মানে ঝামেলা’, ‘দোকানে বসলে মান থাকে না’ — এমন কথা অনেকেই শুনে বড় হয়েছেন। এই ভয়কে অস্বীকার করার দরকার নেই, বরং তাকে ছোট ছোট টুকরো করে দেখুন। ভয়টা আসলে কিসের? টাকা ডুবে যাওয়ার? তাহলে এমন পরিমাণ দিয়ে শুরু করুন যা হারালেও পরিবার পথে বসবে না। লোকের কথার? তাহলে মনে রাখুন, আপনার সফলতা বা ব্যর্থতা দুটোই লোকে ক-দিন পরে ভুলে যাবে, কিন্তু চেষ্টা না করার আফসোস আপনি সারাজীবন বয়ে বেড়াবেন।
নিরাপদ বন্দরে নৌকা সবচেয়ে নিরাপদ — কিন্তু নৌকা বন্দরে বসে থাকার জন্য বানানো হয়নি।
— পুরোনো নাবিকদের প্রচলিত কথা, নিজের ভাষায়
তবে সাহস আর হঠকারিতা এক নয়। উদ্যোক্তার সাহস হলো হিসাব করা ঝুঁকি (calculated risk) — অর্থাৎ ঝুঁকিটা কতটা, সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে, তখন কী করবেন — এগুলো আগে থেকে ভেবে রাখা। চাকরি ছেড়ে সব সঞ্চয় নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া সাহস নয়, অনেক সময় সেটা অবিবেচনা। অনেক সফল উদ্যোক্তা প্রথমে চাকরির পাশাপাশি সন্ধ্যায় বা ছুটির দিনে কাজ শুরু করেছেন, তারপর আয় একটা স্থির জায়গায় পৌঁছলে পুরোপুরি নেমেছেন।
‘কেন’ — আপনার ব্যবসার শিকড়
কঠিন দিনে, যখন বিক্রি নেই, কারিগর আসেনি, পাওনাদার ফোন করছে — তখন আপনাকে টিকিয়ে রাখবে আপনার ‘কেন’। আপনি ব্যবসা কেন করছেন? শুধু টাকার জন্য? টাকা জরুরি, কিন্তু শুধু টাকা অনেক সময় যথেষ্ট জ্বালানি দেয় না। হয়তো আপনি চান গ্রামের তাঁতিরা ন্যায্য দাম পাক, হয়তো চান মা-বাবাকে একটা ভালো জীবন দিতে, হয়তো চান এমন একটা জিনিস বানাতে যা আগে কেউ বানায়নি। নিজের ‘কেন’-টা এক লাইনে লিখে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখুন।
ফুলিয়ার মেয়ে পায়েল বসাকের (কাল্পনিক চরিত্র) কথা ভাবুন। তার বাবা তাঁতি, অথচ শহরের বড় দোকানে একই শাড়ি তিনগুণ দামে বিক্রি হয়, তাঁতির হাতে আসে সামান্যই। পায়েলের ‘কেন’ ছিল খুব পরিষ্কার: ‘যে হাত শাড়ি বোনে, সেই হাতে যেন সম্মান আর ন্যায্য টাকা পৌঁছায়।’ এই বাক্যটাই পরে তার ব্র্যান্ড ‘তাঁতঘর’-এর মূল কথা হয়ে উঠেছিল। আমরা পরের অধ্যায়গুলোতে পায়েলের সঙ্গে আবার দেখা করব।
ওয়ার্কশিট ১: নিজেকে চিনুন
একটা খাতা নিন, আর সৎভাবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখুন। উত্তর ঠিক বা ভুল বলে কিছু নেই — এটা শুধু নিজেকে দেখার আয়না।
- আমি কোন কাজটা করতে গেলে সময়ের হিসাব ভুলে যাই?
- আমার কোন দক্ষতা আছে যার জন্য লোকে আমার কাছে আসে বা পরামর্শ চায়?
- আমি মাসে কত টাকা হারালেও সংসার চলবে? (এটাই আপনার ঝুঁকির সীমা)
- সপ্তাহে কত ঘণ্টা আমি নতুন কাজে দিতে পারি — সত্যি সত্যি?
- পরিবারের কে আমার পাশে থাকবে, আর কার সঙ্গে আগে খোলাখুলি কথা বলা দরকার?
- আমার ব্যবসার ‘কেন’ এক বাক্যে কী?
- গত এক বছরে আমি কোন নতুন জিনিস শিখেছি? আগামী তিন মাসে কী শিখব?
এই ওয়ার্কশিট তিন মাস পরে আবার খুলে দেখবেন। দেখবেন, কিছু উত্তর বদলে গেছে। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ উদ্যোক্তার মন স্থির নয়, সে বাড়ে।
শুরুর আগে একটা ছোট চেকলিস্ট
- জরুরি খরচের জন্য অন্তত কয়েক মাসের সংসার-খরচ আলাদা করে রেখেছি কি?
- পরিবারকে পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে বলেছি কি?
- ব্যবসার টাকা আর সংসারের টাকা আলাদা রাখার জন্য একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কথা ভেবেছি কি?
- প্রতিদিন রাতে দশ মিনিট হিসাব লেখার অভ্যাস শুরু করেছি কি?
- এমন একজন অভিজ্ঞ মানুষকে চিনি কি, যাঁর কাছে মাঝে মাঝে পরামর্শ চাইতে পারি?
মনে রাখবেন, উদ্যোক্তা হওয়া একটা দৌড় নয়, একটা দীর্ঘ পথচলা। প্রথম দিনেই সব জানতে হবে না। শুধু শুরু করতে হবে, শিখতে হবে, আর হাল না ছেড়ে চলতে হবে। পরের অধ্যায়ে আমরা দেখব, ব্যবসার আসল বীজ কোথায় লুকিয়ে থাকে — মানুষের সমস্যার মধ্যে।
ছোট করে ভাবুন না, কিন্তু ছোট থেকে শুরু করতে লজ্জা পাবেন না।
— এই বইয়ের মূলমন্ত্র